দক্ষিণ আমেরিকার তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনেজুয়েলায় নাটকীয় সেনা অভিযান এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশটির তেল সম্পদের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক আটকের মাত্র ১০ দিনের মাথায় আনুষ্ঠানিকভাবে ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল বিক্রি শুরু করেছে ওয়াশিংটন।
মার্কিন প্রশাসনের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ইতোমধ্যে প্রথম চালানের তেল বিক্রি থেকে প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের রাজস্ব সংগৃহীত হয়েছে। এই পদক্ষেপকে লাতিন আমেরিকায় মার্কিন ভূ-রাজনৈতিক ও জ্বালানি কূটনীতির এক নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট শুরু হয় গত ৪ জানুয়ারি ভোরের এক নজিরবিহীন সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে। মার্কিন বিশেষ বাহিনী রাজধানী কারাকাসে প্রেসিডেন্টের বাসভবনে অভিযান চালিয়ে নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে। বর্তমানে তারা নিউইয়র্ক সিটির একটি ফেডারেল কারাগারে বন্দি রয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের অভিযোগে তাদের বিচার প্রক্রিয়ার প্রস্তুতি চলছে।
এই অভিযানের পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার জ্বালানি খাতের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। গত ৭ জানুয়ারি তিনি জানান যে, ভেনেজুয়েলার মজুত থেকে প্রায় ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল যুক্তরাষ্ট্রে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যার প্রথম কিস্তির বিক্রিই এখন সম্পন্ন হলো।
হোয়াইট হাউস সূত্রমতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদকে কেবল মার্কিন স্বার্থে নয়, বরং দেশটির অবকাঠামো পুনর্গঠনের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করছেন। গত ৯ জানুয়ারি ওয়াশিংটনে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের সাথে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার তেল শিল্পে অচিরেই অন্তত ১০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন।
তিনি প্রত্যাশা করছেন যে, মার্কিন জায়ান্ট কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার জরাজীর্ণ তেল অবকাঠামো সংস্কারে এগিয়ে আসবে। তবে ট্রাম্পের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনার বিপরীতে বড় কোম্পানিগুলোর মধ্যে কিছুটা সংশয় ও সতর্ক অবস্থান লক্ষ করা গেছে।
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল কোম্পানি এক্সন মোবিলের প্রধান নির্বাহী ড্যারেন উডস সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে, বর্তমান অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার তেল খাতে তড়িঘড়ি করে বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন যে, সেখানে বিনিয়োগের রিটার্ন বা লভ্যাংশ নিশ্চিত করার মতো সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি বা বাণিজ্যিক কাঠামো এখনো তৈরি হয়নি।
বিনিয়োগের আগে একটি স্বচ্ছ এবং দীর্ঘমেয়াদী ফ্রেমওয়ার্ক গঠন করা অপরিহার্য বলে তিনি মনে করেন। অন্য অনেক কোম্পানিও একই ধরনের পর্যবেক্ষণ দিয়েছে, যার ফলে ট্রাম্পের কাঙ্ক্ষিত শত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ বাস্তবে রূপ পেতে আইনি জটিলতা ও সময়ের প্রয়োজন হতে পারে।
ভৌগোলিক ও ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে ভেনেজুয়েলা বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের মজুতধারী দেশ। মার্কিন জ্বালানি তথ্য সংস্থা (ইআইএ)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির খনিগুলোতে ৩০ হাজার ৩০০ কোটি ব্যারেলেরও বেশি তেল মজুত রয়েছে, যা বিশ্বের মোট মজুতের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
তবে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিষেধাজ্ঞা এবং কারিগরি ব্যবস্থাপনার অভাবে দেশটির উৎপাদন ক্ষমতা বর্তমানে তলানিতে এসে ঠেকেছে। বর্তমানে ভেনেজুয়েলা প্রতিদিন গড়ে মাত্র ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করে, যা বিশ্ববাজারের চাহিদার ১ শতাংশের চাইতেও কম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেনেজুয়েলার তেল গুণগতভাবে ভারী ও ঘন হওয়ায় এটি উত্তোলন এবং পরিশোধন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল। এর জন্য উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন যা কেবল পশ্চিমা বড় কোম্পানিগুলোর কাছেই রয়েছে। যদি মার্কিন নিয়ন্ত্রণে এই তেল উত্তোলনের হার বাড়ানো সম্ভব হয়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও সুদৃঢ় হবে। তবে আন্তর্জাতিক মহলে এই সেনা অভিযান ও প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ নিয়ে প্রশ্নও উঠছে, যা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক আইনের নিরিখে ভিন্ন মাত্রা পেতে পারে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যকার এই নতুন জ্বালানি চুক্তি লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একদিকে যেমন ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে মার্কিন বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যটিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
