উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক মহাসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রকাশ্য ও অনমনীয় মনোভাব ব্যক্ত করার পর, ডেনমার্ক সরকার এই স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশে তাদের সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে, দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর অগ্রবর্তী কমান্ডের বেশ কয়েকটি বিশেষ ইউনিটকে গ্রিনল্যান্ডে পাঠানোর প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই পদক্ষেপকে আর্কটিক অঞ্চলে সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ডেনমার্কের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত অবস্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ডেনমার্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘ডিআর’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেনিশ সেনাবাহিনীর এই অগ্রবর্তী দলগুলোর প্রাথমিক লক্ষ্য হবে গ্রিনল্যান্ডের প্রতিকূল পরিবেশে লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা। ডেনমার্কের প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল এনহেডস্লিস্টেন পার্টি সরকারের এই উদ্যোগকে জোরালোভাবে সমর্থন জানিয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল ডেনমার্কের নয়, বরং পুরো ইউরোপের জন্য একটি অপরিহার্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এনহেডস্লিস্টেন পার্টির একজন মুখপাত্র সংবাদমাধ্যমকে বলেন, সরকারের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপ একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে। যদি কোনো পরাশক্তি গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্বে আঘাত হানার চেষ্টা করে, তবে ডেনমার্ক তার মিত্রদের নিয়ে তা রুখে দিতে প্রস্তুত। উল্লেখ্য যে, ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশ গ্রিনল্যান্ডে সামরিক সহায়তা পাঠানোর বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছে, যা বিষয়টিকে একটি বহুজাতিক রূপ দিচ্ছে।
ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রায় ২১ লাখ ৬৬ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই বিশাল দ্বীপটির জনসংখ্যা মাত্র ৫৬ হাজারেরও কিছু বেশি, যার সিংহভাগই আদিবাসী ইনুইট সম্প্রদায়ের। উত্তর আমেরিকা মহাদেশের ভৌগোলিক সীমানায় অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও গ্রিনল্যান্ড ঐতিহাসিকভাবে ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অংশ এবং এর বাসিন্দারা ডেনিশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকত্ব ভোগ করেন।
দ্বীপটি বছরের অধিকাংশ সময় বরফে ঢাকা থাকলেও এর ভূগর্ভে সঞ্চিত বিপুল পরিমাণ খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং মূল্যবান খনিজ সম্পদের ভাণ্ডার বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর নজর কেড়েছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ গলতে শুরু করায় আর্কটিক অঞ্চলের নতুন নৌপথ এবং খনিজ আহরণের সম্ভাবনা এই ভূখণ্ডটিকে ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ে সরব রয়েছেন। গত ১০ জানুয়ারি হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি তার পরিকল্পনার কথা পুনরায় ব্যক্ত করেন। ট্রাম্পের দাবি, গ্রিনল্যান্ড যদি যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানায় না আসে, তবে চীন বা রাশিয়া এই কৌশলগত অঞ্চলটি দখল করে নেবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, ১৯৫১ সালের প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুযায়ী গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি থাকলেও দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার জন্য দ্বীপটির মালিকানা বা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। ট্রাম্পের এমন মন্তব্যকে ডেনমার্ক এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং একটি স্বাধীন অঞ্চলের ওপর জবরদখল চেষ্টার শামিল বলে মনে করছেন।
ট্রাম্পের এই ‘গ্রিনল্যান্ড ক্রয়’ বা দখলের প্রস্তাব ডেনমার্ক সরকার এবং গ্রিনল্যান্ডের স্থানীয় প্রশাসন সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ডেনমার্ক সরকার বারবার জানিয়েছে যে, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়। তবে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আসা ক্রমাগত চাপের মুখে কোপেনহেগেন এখন আর কেবল কূটনৈতিক প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রিনল্যান্ডে ডেনমার্কের সেনা বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী মনোভাবের বিরুদ্ধে একটি প্রতিরক্ষা ঢাল তৈরির চেষ্টা। এটি প্রমাণ করে যে, ডেনমার্ক তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ন্যাটোর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও ওয়াশিংটনের অযৌক্তিক দাবি মানতে নারাজ।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ট্রাম্পের এই বক্তব্য নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। রাশিয়া এবং চীন ইতিমধ্যে আর্কটিক অঞ্চলে তাদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের প্রধান কারণ। কিন্তু ট্রাম্পের ‘মালিকানা রক্ষা’র তত্ত্ব ইউরোপীয় মিত্রদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ফাটলকে আরও প্রশস্ত করছে।
ডেনমার্কের এই সামরিক তৎপরতা মূলত উত্তর মেরু অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের এক মহাযুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে গ্রিনল্যান্ড এখন একটি দাবার গুটিতে পরিণত হয়েছে। কোপেনহেগেনের এই পদক্ষেপ কেবল লজিস্টিক শক্তিবৃদ্ধি নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক ঘোষণা—যেখানে তারা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে গ্রিনল্যান্ডের ভাগ্য নির্ধারণ করবে কেবল এর জনগণ এবং ডেনমার্ক, অন্য কোনো বহিঃশক্তি নয়।
