বাংলাদেশের ছোট পর্দার বর্তমান সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় ও ব্যস্ত অভিনেত্রী জান্নাতুল সুমাইয়া হিমি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভক্তদের নেতিবাচক মন্তব্যের প্রেক্ষিতে নিজের দৃঢ় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। অভিনয়ের ব্যস্ত শিডিউলের মাঝেও ভক্তদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করেন এই তারকা।
তবে সম্প্রতি তার সাজগোজ নিয়ে করা এক অনুরাগীর অযাচিত মন্তব্যের বিপরীতে তার দেওয়া পাল্টা জবাব এখন নেটদুনিয়ায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। হিমি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, কোনো অবস্থাতেই সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয় এবং একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত পছন্দ বা রুচির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা জরুরি।
ঘটনার সূত্রপাত হয় হিমির একটি ফেসবুক লাইভ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। লাইভে তিনি যখন তার অনুসারীদের সাথে সমসাময়িক কাজ এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা দিক নিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই এক অনুরাগী তার মেকআপ বা প্রসাধনী ব্যবহারের ধরন নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেন।
ওই ব্যক্তি মন্তব্য করেন যে, চোখে মেকআপ না করলে তাকে দেখতে আরও বেশি সুন্দর লাগত। ভক্তের এমন অযাচিত এবং অপ্রাসঙ্গিক পরামর্শে এই অভিনেত্রী কিছুটা বিরক্ত ও হতাশ বোধ করেন। সাধারণত তারকারা এ ধরনের মন্তব্য এড়িয়ে চললেও, হিমি এবার চুপ না থেকে তাৎক্ষণিক এবং যৌক্তিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর সিদ্ধান্ত নেন।
সেই মন্তব্যের উত্তরে হিমি বলেন যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু মানুষের স্বভাবই হলো অহেতুক সমালোচনা করা। তিনি আক্ষেপ করে জানান যে, একজন শিল্পী যখন সাধারণ সাজে থাকেন, তখন সমালোচনা করা হয় কেন তিনি পরিপাটি নন। আবার যখন ক্যামেরার সামনে বা বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানে মানানসই মেকআপ করেন, তখন বলা হয় মেকআপ ছাড়াই তাকে ভালো দেখাত।
এই বিপরীতমুখী মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে তিনি উপলব্ধি করেন যে, কোনোভাবেই সবাইকে খুশি করা বা সবার প্রত্যাশা পূরণ করা একজন ব্যক্তির পক্ষে অসম্ভব। তিনি মনে করেন, ভক্তদের ভালোবাসা যেমন কাম্য, তেমনি তাদের উচিত প্রিয় শিল্পীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও রুচিবোধকে সম্মান জানানো।
হিমি তার সাজগোজের পক্ষে যুক্তি দিয়ে আরও যোগ করেন যে, প্রতিটি পোশাক এবং অনুষ্ঠানের একটি নিজস্ব চাহিদা থাকে। সেদিন তার পরিহিত পোশাকের সাথে সামঞ্জস্য রাখতেই তিনি কিছুটা নিপুণভাবে সেজেছিলেন। নিজের পছন্দমতো সাজগোজ করার অধিকার যে কোনো মানুষের মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত, সেটিই তিনি তার বক্তব্যে ফুটিয়ে তোলেন।
তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দেন যে, একজন শিল্পী যদি নিজের ভালো লাগা থেকে কিছুটা সেজেগুজে ভক্তদের সামনে আসতে চান, তবে সেখানে অন্যের সমস্যা হওয়ার কারণ কী থাকতে পারে। তার এই প্রশ্ন মূলত সেই সব মানুষদের প্রতি যারা প্রতিনিয়ত তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন ও বাহ্যিক অবয়ব নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করতে ব্যস্ত থাকেন।
পরবর্তীতে এই কথোপকথনের বিশেষ অংশটি হিমি নিজের ফেসবুক পেজে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও বা রিলস হিসেবে প্রকাশ করেন। ভিডিওটি পোস্ট করার স্বল্প সময়ের মধ্যেই তা ব্যাপক প্রচার পায় এবং নেটিজেনদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। তবে সিংহভাগ ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষী হিমির এই সাহসী ও স্পষ্টবাদী অবস্থানের প্রশংসা করেছেন।
তারা মনে করেন, তারকাদের পর্দার বাইরের জীবন এবং তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ নিয়ে অযথা কাটাছেঁড়া করা এক ধরনের অসংবেদনশীলতা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকলেও তা যেন অন্যের ব্যক্তিগত সীমানা লঙ্ঘন না করে, সে বিষয়ে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।
আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোতে যেমন সেলিব্রিটি কালচার এবং সাইবার বুলিং বা অনলাইন হয়রানি নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হয়, হিমির এই ঘটনাটিও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একই ধরনের গুরুত্ব বহন করে। একজন পেশাদার শিল্পী হিসেবে হিমি দীর্ঘ সময় ধরে বিনোদন জগতে নিজের মেধা ও শ্রম দিয়ে স্থান করে নিয়েছেন।
তার অভিনয় দক্ষতা যেমন প্রশংসিত, তেমনি তার ব্যক্তিত্বও দর্শকদের কাছে সমাদৃত। এই ঘটনার মাধ্যমে তিনি সমাজের একটি রূঢ় বাস্তবতাকে সামনে এনেছেন যে, একজন নারী বা একজন তারকাকে সবসময় অন্যের তৈরি করা মাপকাঠিতে বিচার করার প্রবণতা এখনো বিদ্যমান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারকাদের সাথে সরাসরি কথা বলার সুযোগ তৈরি হওয়ার ফলে একদিকে যেমন দূরত্ব কমেছে, অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রে সৌজন্যবোধের অভাবও পরিলক্ষিত হচ্ছে। হিমির মতো জনপ্রিয় একজন অভিনেত্রী যখন সরাসরি এমন নেতিবাচক মানসিকতার প্রতিবাদ করেন, তখন তা অন্য শিল্পীদের জন্যও একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করে। এটি স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয় যে, ভক্ত হওয়া মানেই এই নয় যে কেউ একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত সাজগোজ বা জীবনযাত্রা নিয়ে যা খুশি বলার অধিকার রাখেন।
বর্তমানে হিমি অসংখ্য নাটকের কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। একের পর এক মানসম্মত কাজ উপহার দিয়ে তিনি দর্শকদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি তার এই নির্ভীক ও স্পষ্ট কথা বলার ধরন তাকে অন্যান্য সমসাময়িক অভিনেত্রীদের থেকে আলাদা করে চিনিয়েছে।
ভক্তদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রাখা এবং প্রয়োজনে নিজের অধিকারের পক্ষে কথা বলা হিমির পেশাদারিত্বেরই একটি অংশ বলে মনে করছেন বিনোদন বিশ্লেষকরা। এই বিতর্কের পরও তিনি তার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন এবং ভক্তদের প্রতি ভালোবাসা অক্ষুণ্ণ রেখেছেন।
পরিশেষে বলা যায়, জান্নাতুল সুমাইয়া হিমির এই প্রতিবাদ কেবল তার একার জন্য নয়, বরং এটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখার একটি জোরালো আহ্বান। পোশাক, মেকআপ বা জীবনযাত্রার ধরন সম্পূর্ণ একটি ব্যক্তিগত বিষয়। একজন গুণী শিল্পী যখন তার কাজ দিয়ে দর্শককে বিনোদিত করছেন, তখন তার কাজের মূল্যায়ন হওয়াই মুখ্য হওয়া উচিত। হিমির এই স্পষ্ট বার্তা ভক্তদের ভবিষ্যতে আরও দায়িত্বশীল এবং সংবেদনশীল হতে অনুপ্রাণিত করবে বলে আশা করা যায়। কোনোভাবেই সবাইকে খুশি করা সম্ভব নয়—এই কঠিন সত্যটি মেনে নিয়েই তিনি সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
