মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক চরম উত্তজনাপূর্ণ মুহূর্তে এসে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিনের বৈরী দুই দেশ, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের শেষ আশাটুকুও যেন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, দেশ দুটির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে বিদ্যমান সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমগুলো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই অনড় অবস্থান পারমাণবিক শক্তিধর এই অঞ্চলে একটি ভয়াবহ সামরিক সংঘাতের শঙ্কাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কঠোর হুঁশিয়ারি এবং ইরানের পাল্টা হুমকির প্রেক্ষাপটে পুরো বিশ্ব এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে।
আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকোফের মধ্যে যে সরাসরি আলোচনার পথ খোলা ছিল, তা বর্তমানে স্থগিত করা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা বুধবার এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। সাধারণত যুদ্ধের দামামা বাজার পূর্বমুহূর্তে বা আলোচনার সব পথ রুদ্ধ হয়ে গেলেই এ ধরনের সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা ঘটে। বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি সংলাপ বন্ধ হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো যেকোনো ভুল বোঝাবুঝি এখন সরাসরি সামরিক সংঘাতের রূপ নিতে পারে, যা সামাল দেওয়ার মতো কোনো মধ্যস্থতাকারী পক্ষ এই মুহূর্তে দৃশ্যমান নয়।
এই কূটনৈতিক অচলাবস্থার পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু কড়া মন্তব্য। গত কয়েকদিন ধরে ইরানে অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমনের ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে দেশটিতে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়ে আসছেন ট্রাম্প। তার হুমকির সুর দিন দিন আরও কঠোর ও আক্রমণাত্মক হচ্ছে, যা তেহরানকে চরম রক্ষণাত্মক অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে। ওয়াশিংটনের এই মারমুখী অবস্থানের জবাবে ইরানও হাত গুটিয়ে বসে নেই। ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের সামরিক কর্মকর্তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের ভূখণ্ডে বা স্বার্থে আঘাত করা হলে তার দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইলের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধের এই আশঙ্কার মধ্যেই একটি ইঙ্গিতপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে পেন্টাগন। কাতারের রাজধানী দোহায় অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ‘আল-উদেইদ’ থেকে বেশ কিছু সেনাকে জরুরি ভিত্তিতে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিন জন বিদেশি কূটনীতিক রয়টার্সকে জানিয়েছেন যে, বুধবার সন্ধ্যার মধ্যেই নির্ধারিত সংখ্যক সেনাকে নিরাপদ অবস্থানে সরে যেতে বলা হয়েছে। যদিও মার্কিন দূতাবাস বা পেন্টাগন এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি, তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে এটি মূলত একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা অবস্থান। ১০ হাজারেরও বেশি মার্কিন সেনা অধ্যুষিত এই ঘাঁটিটি থেকে সেনা সরানোর অর্থ হতে পারে—যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলার ঝুঁকি কমাতে চাইছে অথবা কোনো বড় ধরণের সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তবে একজন কূটনীতিক এই সেনা সরানোর ঘটনাকে কেবল ‘অবস্থানের পরিবর্তন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এটি কোনোভাবেই ঘাঁটিটি পুরোপুরি ত্যাগ করার সংকেত নয়, বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে সেনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি আগাম সতর্কতা মাত্র। তবুও মধ্যপ্রাচ্যের মতো অস্থিতিশীল অঞ্চলে এমন বড় ঘাঁটির বিন্যাস পরিবর্তন আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। আল-জাজিরা ও রয়টার্সের সংবাদ বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, কাতারের এই ঘাঁটিটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখা হয়।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অসন্তোষ এখন সরাসরি যুদ্ধের প্ররোচনায় রূপ নিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ওয়াশিংটন যে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করেছে, তা ইরানকে আলোচনার টেবিল থেকে দূরে সরিয়ে সামরিক প্রস্তুতির দিকে ধাবিত করছে। অন্যদিকে, ইরানের আঞ্চলিক মিত্ররা—যাদের প্রায়শই ‘প্রক্সী ফোর্স’ বলা হয়—তারাও এই পরিস্থিতিতে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে যুদ্ধ শুরু হলে তা কেবল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো লেভান্ত ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়াটা বিশ্বশান্তির জন্য একটি অশনি সংকেত। এর আগে বিভিন্ন সংকটের সময় সুইজারল্যান্ড বা ওমানের মাধ্যমে পরোক্ষ বার্তা আদান-প্রদান করা হলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সুযোগগুলোও সীমিত হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছে যে, বাগাড়ম্বরপূর্ণ হুমকিগুলো কখন প্রকৃত গোলাবর্ষণে রূপ নেয়। কাতার ও ওমানের মতো দেশগুলো পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে গেলেও, ট্রাম্পের অনড় অবস্থান এবং ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষার অঙ্গীকার সংঘাতকে অনিবার্য করে তুলছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরিস্থিতি যে দিকে মোড় নিচ্ছে, তাতে যেকোনো সময় মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের মেঘ আরও ঘনীভূত হতে পারে। কাতারের ঘাঁটি থেকে সেনা স্থানান্তর এবং তেহরানের পাল্টা হামলার হুমকি মূলত একটি বৃহৎ মহড়া কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজার থেকে শুরু করে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এই উত্তেজনার প্রভাব ইতিমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে। এখন দেখার বিষয়, শেষ মুহূর্তে কোনো অলৌকিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয় কি না।
