সহপাঠী সাকিবুল হাসান রানা হত্যাকাণ্ডের এক মাস অতিক্রান্ত হলেও প্রধান অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন তেজগাঁও কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বুধবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে তারা রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ফার্মগেট সংলগ্ন নামার পথ (র্যাম্প) অবরোধ করেন। এর কিছুক্ষণ পর, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তারা তেজগাঁও কলেজের সামনের প্রধান সড়ক ও ব্যস্ততম ফার্মগেট মোড়ে অবস্থান গ্রহণ করলে পুরো এলাকায় যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, গত ১০ ডিসেম্বর সাকিবের মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় পার হলেও পুলিশ মামলার মূল আসামিদের আইনের আওতায় আনতে ব্যর্থ হয়েছে। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির প্রতিবাদে এবং খুনিদের দ্রুততম সময়ে গ্রেপ্তারের দাবিতে তারা রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন। অবরোধ চলাকালে শিক্ষার্থীদের ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে’, ‘জাস্টিস ফর সাকিব’ এবং ‘আমার ভাইয়ের রক্ত, বৃথা যেতে দেব না’—এমন সব সংবেদনশীল ও ক্ষুব্ধ স্লোগানে পুরো ফার্মগেট এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত বছরের ৬ ডিসেম্বর রাতে। রাজধানীর তেজগাঁও কলেজ ছাত্রাবাসে মাদক সেবন ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের দুটি পক্ষের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সংঘাতের সময় গুরুতর আহত হন উচ্চমাধ্যমিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিবুল হাসান রানা।
আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। সেখানে চার দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ১০ ডিসেম্বর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রানা। মেধাবী এই শিক্ষার্থীর অকাল মৃত্যুতে সেই সময় থেকেই কলেজ ক্যাম্পাসে শোক ও উত্তেজনার ছায়া বিরাজ করছে।
বুধবারের এই অবরোধ কর্মসূচির ফলে ঢাকার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক ও যাতায়াত কেন্দ্র ফার্মগেট এলাকায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের একটি অংশ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিমানবন্দর অভিমুখী এবং বিমানবন্দর থেকে শহরমুখী যানবাহনগুলো দীর্ঘ সারিতে আটকা পড়েছে।
এর প্রভাবে কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি, শাহবাগ ও পান্থপথ এলাকায় ভয়াবহ যানজট ছড়িয়ে পড়েছে। বাসের অপেক্ষায় থাকা শত শত যাত্রীকে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। অনেক অফিসগামী যাত্রী ও সাধারণ মানুষ বিকল্প পথ না পেয়ে পায়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
ঘটনাস্থলে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা শিক্ষার্থীদের শান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পুলিশ শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে কথা বলেছে এবং তাদের দাবির বিষয়ে ঊর্ধ্বতন মহলের আশ্বাসের কথা জানিয়েছে।
তবে শিক্ষার্থীরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত খুনিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা বা দৃশ্যমান পদক্ষেপ না আসবে, ততক্ষণ তারা সড়ক থেকে সরবেন না। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
তেজগাঁও কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরা জানান, সাকিবুলের হত্যার বিচার চাওয়া তাদের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং এক সহপাঠীকে হারানোর ন্যায়বিচার পাওয়ার আকুতি। তারা মনে করছেন, প্রশাসনের এই দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন কলেজের অনেক সাধারণ ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকবৃন্দ।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই মোড়ে অবরোধের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাধারণ নাগরিকদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হওয়ার পথে থাকলেও পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশা করছে, আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণের আশ্বাস দিয়ে খুব দ্রুতই এই অচল অবস্থার অবসান ঘটানো সম্ভব হবে। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা তাদের দাবিতে অনড় অবস্থানে রয়েছেন।
