দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ দ্রুত জারির দাবিতে আবারও রাজপথে নেমেছেন রাজধানীর সাত সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা। বুধবার দুপুর পৌনে ১টার দিকে ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাস থেকে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে তারা রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সায়েন্সল্যাব মোড় অবরোধ করেন। শিক্ষার্থীদের এই আকস্মিক কর্মসূচির ফলে মিরপুর রোড ও আজিমপুর অভিমুখে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, যার প্রভাবে ধানমণ্ডি, নীলক্ষেত ও সংলগ্ন এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হলেও শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি আদায়ে অটল অবস্থানে রয়েছেন।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মূল দাবি হচ্ছে, আগামীকাল ১৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া উপদেষ্টা পরিষদের সভায় ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি আইন–২০২৫’-এর হালনাগাদ খসড়াটির চূড়ান্ত অনুমোদন নিশ্চিত করা। একইসঙ্গে তারা রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই আইনটি অধ্যাদেশ আকারে জারির দাবি জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, রাজধানীর সাতটি সরকারি কলেজকে সমন্বিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দীর্ঘ দিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষার্থীরা। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের ওয়েবসাইটে প্রস্তাবিত আইনের একটি প্রাথমিক খসড়া প্রকাশ করেছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন অংশীজন ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনার মাধ্যমে সেই খসড়াটি পরিমার্জন ও হালনাগাদ করা হয়।
শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এর আগে গত ৭ ও ৮ ডিসেম্বর শিক্ষা ভবনের সামনে তারা টানা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছিলেন। সেই সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধি দলের ফলপ্রসূ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গিয়েছিল যে, মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই অধ্যাদেশ জারির বিষয়ে জোরালো আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।
তবে জানুয়ারির মাঝামাঝি সময় পার হয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা ছড়িয়ে পড়ে। তাদের অভিযোগ, বারবার আশ্বাস দেওয়া সত্ত্বেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অধ্যাদেশ জারির প্রক্রিয়াটি থমকে আছে, যা সাত কলেজের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সায়েন্সল্যাব মোড়ে অবস্থান নেওয়া বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে রাজপথ মুখরিত করে তুলছেন। তাদের দাবি, প্রস্তাবিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি হবে একটি আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যা রাজধানীর শিক্ষা ব্যবস্থার প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও শিক্ষার মানোন্নয়নে মাইলফলক হয়ে থাকবে।
আন্দোলন সমন্বয়কারীদের একজন গণমাধ্যমকে জানান, তারা কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রাজপথে নামেননি, বরং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতেই এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত সরকার বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অধ্যাদেশ জারির জোরালো ঘোষণা না আসবে, ততক্ষণ তারা রাস্তা ছাড়বেন না।
এদিকে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এক বিশেষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশের চূড়ান্ত অনুমোদনের বিষয়টি বর্তমানে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। মঙ্গলবার পাঠানো ওই বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয় যে, প্রশাসনিক উৎকর্ষ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের যৌক্তিক দাবি পূরণের লক্ষ্যেই এই অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় আরও জানায়, বর্তমানে খসড়াটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নীতিগত সম্মতির অপেক্ষায় রয়েছে। এরপর লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের পক্ষ থেকে আইনি যাচাই বা ভেটিং সম্পন্ন হওয়ার পর এটি দ্রুততম সময়ে উপদেষ্টা পরিষদের চূড়ান্ত সভায় উপস্থাপিত হবে। সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব এড়াতে সংশ্লিষ্ট সব বিভাগকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
রাজধানীর এই গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে অবরোধের ফলে আশপাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অফিসগামী মানুষ বিপাকে পড়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সায়েন্সল্যাব মোড়ে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, তবে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতায় আসার চেষ্টা করছেন যাতে জনদুর্ভোগ কমিয়ে দ্রুত যান চলাচল স্বাভাবিক করা যায়। তবে শিক্ষার্থীদের অনড় মনোভাবের কারণে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার এই উদ্যোগ রাজধানীর উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন নিয়ে আসবে। সাত কলেজের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর প্রশাসনিক ও একাডেমিক সমস্যা নিরসনে একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন দীর্ঘদিনের।
তবে এই প্রক্রিয়াটি যেন কেবল নাম পরিবর্তন বা প্রশাসনিক রদবদলে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং শিক্ষার গুণগত মান ও অবকাঠামোগত উন্নয়নেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেই প্রত্যাশা সবার। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন সরকারের ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি করেছে, যা আগামীকালের উপদেষ্টা পরিষদের সভায় প্রতিফলিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, রাজধানীর রাজপথে শিক্ষার্থীদের এই অবস্থান কর্মসূচি কেবল একটি অধ্যাদেশ দাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন দেখার বিষয়, আগামীকালের সভায় সরকার শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে কী ধরনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে অধ্যাদেশ জারি না হচ্ছে, ততক্ষণ শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাধারণ মানুষ আশা করছেন, সরকার ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি সুষ্ঠু আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত এই অচলাবস্থার অবসান ঘটবে এবং জনজীবন স্বাভাবিক হবে।
