কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে মিয়ানমার থেকে ছোঁড়া গুলিতে গুরুতর আহত ১২ বছর বয়সী শিশু হুজাইফা আফনানের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে থেকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে শিশুটির মস্তিষ্কে বিদ্ধ গুলিটি অপসারণ করা সম্ভব না হওয়ায় তার জীবন সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। এই কঠিন পরিস্থিতিতে হুজাইফার প্রাণভিক্ষা চেয়ে দেশবাসীর কাছে দোয়া প্রার্থনা করেছেন তার পরিবার।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল থেকে একটি বিশেষ অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। হুজাইফার সঙ্গে পরিবারের তিন সদস্য ছাড়াও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) একজন সদস্য রয়েছেন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হুজাইফার চিকিৎসার জন্য গঠিত বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ড দীর্ঘ পর্যালোচনার পর তাকে ঢাকায় পাঠানোর সুপারিশ করেছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মিয়ানমারের ওপার থেকে আসা গুলিটি শিশুটির মস্তিষ্কের অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশে আটকে আছে। সোমবার রাতে দ্বিতীয় দফায় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে গুলিটি বের করার চেষ্টা করা হলেও অতিরিক্ত ঝুঁকির আশঙ্কায় চিকিৎসকরা পিছু হটেন।
চমেক হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক হারুনুর রশিদ এই জটিল পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, “গুলিটি মস্তিষ্কের পেছনের অংশে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালির খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। এই অবস্থায় জোরপূর্বক অস্ত্রোপচার করতে গেলে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হয়ে রোগীর তাৎক্ষণিক প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে।” চিকিৎসকরা আরও জানিয়েছেন, মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ চাপ (ইন্ট্রাক্রেনিয়াল প্রেসার) কমানোর জন্য অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে হুজাইফার মাথার খুলির একটি অংশ সাময়িকভাবে খুলে রাখা হয়েছে।
হুজাইফার চাচা শওকত আলী আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “আমার ছোট ভাতিজিটা কোনো অপরাধ ছাড়াই আজ মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। ডাক্তাররা বলেছেন এখানে আর কিছু করা সম্ভব নয়, তাই ঢাকায় নেওয়া হচ্ছে। আমরা বড় অসহায় বোধ করছি। পুরো দেশবাসীর কাছে অনুরোধ, আমার মা মণিটার জন্য আপনারা একটু দোয়া করবেন।”
উল্লেখ্য, গত রোববার (১১ জানুয়ারি) সকালে টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় নিজ বাড়ির আঙিনায় খেলা করার সময় হঠাৎ মিয়ানমার সীমান্ত থেকে ধেয়ে আসা একটি গুলি হুজাইফার মাথায় বিদ্ধ হয়। সে স্থানীয় বাসিন্দা জসিম উদ্দিনের মেয়ে। এই ঘটনার পর সীমান্তে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং বিজিবির পক্ষ থেকে কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তাসলিম উদ্দিন গণমাধ্যমকে জানান, রোববার বিকেলে হুজাইফাকে হাসপাতালে আনার পর থেকেই তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল। তবে বিশেষায়িত সরঞ্জামের প্রয়োজনীয়তা এবং নিউরো-সার্জারির জটিলতার কথা বিবেচনা করে তাকে ঢাকার নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সীমান্তে বিজিবির নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং স্থানীয় প্রশাসন আহত শিশুর পরিবারের খোঁজখবর রাখছে।
মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান জান্তা বাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার সংঘর্ষের জেরে মাঝেমধ্যেই বাংলাদেশের সীমান্তে গোলা এসে পড়ছে। তবে হুজাইফার মতো একটি নিষ্পাপ শিশুর মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ঢাকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অধীনে হুজাইফা ফিরে পাবে তার স্বাভাবিক জীবন—এমনটাই প্রত্যাশা সবার।
