গাইবান্ধায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ জালিয়াতির ঘটনায় দেশজুড়ে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। এই জালিয়াতি চক্রের মূল শিকড় উৎপাটন এবং এর পেছনে থাকা কুশীলবদের শনাক্ত করতে গ্রেপ্তারকৃত ২৬ আসামির প্রত্যেকের দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) দুপুরে গাইবান্ধার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান দীর্ঘ শুনানি শেষে এই আদেশ প্রদান করেন। এর আগে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. সোহান মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও তথ্য উদঘাটনের স্বার্থে প্রত্যেক আসামির পাঁচ দিন করে রিমান্ডের আবেদন জানিয়েছিলেন।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জালিয়াতি চক্রটি অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। রিমান্ড চলাকালীন আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে এই চক্রের মাস্টারমাইন্ড বা ডিভাইস সরবরাহকারী, চুক্তিবদ্ধ মধ্যস্বত্বভোগী এবং যারা পরীক্ষার হলের বাইরে থেকে উত্তর সরবরাহ (রিয়েল-টাইম সাপোর্ট) করছিল, তাদের খুঁজে বের করাই এখন প্রধান লক্ষ্য। এছাড়া অর্থ লেনদেনের মাধ্যম এবং ডিভাইস সংগ্রহের উৎস সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই চক্রের সদস্যরা কানের ভেতরে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ব্লুটুথ ডিভাইস লুকিয়ে রেখে পরীক্ষা দিচ্ছিল। পরীক্ষার আগে ও চলাকালীন সময়ে তাদের মধ্যকার যোগাযোগ ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গাইবান্ধা সদর থানায় দায়ের করা এই মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৪০ জন। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ২৬ জন পুরুষ আসামিকে আজ আদালতে হাজির করা হয়েছিল। উল্লেখ্য যে, মামলায় ১১ জন নারী আসামি থাকলেও তাদের ক্ষেত্রে কোনো রিমান্ড আবেদন করেনি পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, ছোট শিশু ও মানবিক দিক বিবেচনা করে নারী আসামিদের এখনই রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন মনে করা হয়নি। বর্তমানে মামলার আরও তিন আসামি পলাতক রয়েছেন, যাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
গত ৯ জানুয়ারি গাইবান্ধা সদরসহ পলাশবাড়ী ও ফুলছড়ি উপজেলার ৪৩টি কেন্দ্রে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা চলাকালে ইলেকট্রনিক ডিভাইসসহ হাতেনাতে মোট ৫২ জন পরীক্ষার্থীকে আটক করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিন থানায় মোট পাঁচটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে।
পলাশবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সরোয়ার আলম খান জানিয়েছেন, তাদের থানায় দায়ের করা তিনটি মামলায় চার নারীসহ মোট ১২ জন আসামি রয়েছেন। সেখানেও আসামিদের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে এবং আদালতের আদেশের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ। জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ইন্সপেক্টর নজরুল ইসলাম জানান, সদর থানার ২৬ আসামিকে রিমান্ডে পাওয়ার পর এই চক্রের ডিজিটাল নেটওয়ার্কটি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, গত ৯ জানুয়ারি দেশজুড়ে ৬১টি জেলায় একযোগে প্রাথমিকের এই নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। গাইবান্ধায় ৪০০-এর অধিক শূন্য পদের বিপরীতে অংশ নিয়েছিলেন ২৭ হাজার ৬৮৮ জন পরীক্ষার্থী। তবে এই জালিয়াতির ঘটনার পর স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিয়ে সাধারণ পরীক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
এর আগে জালিয়াতির অভিযোগে গাইবান্ধার বিভিন্ন কেন্দ্রে ১৪৪ ধারা জারি করেও নকল রুখতে বেগ পেতে হয়েছে প্রশাসনকে। পুলিশের এই কঠোর পদক্ষেপের ফলে নিয়োগ জালিয়াতি চক্রের নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালীদের মুখোশ উন্মোচিত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
