বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা এবং রাজনীতিতে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপরই বর্তায় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নীতি-নির্ধারকরা। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জনগণের প্রত্যাশা ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর পুনর্গঠন নিয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সেমিনারে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, নাগরিক ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে বিদ্যমান আস্থার সংকট নিরসনে স্বচ্ছতা ও সরাসরি জবাবদিহিতার কোনো বিকল্প নেই।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রধান বক্তা হিসেবে দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের রূপরেখা তুলে ধরেন।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে স্বীকার করেন যে, বর্তমানে সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনীতিবিদদের প্রতি এক ধরনের অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, “জনগণ কেন যেন রাজনীতিবিদদের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারছে না, তাদের বিশ্বাস করতে দ্বিধাবোধ করছে।
এটি একটি রূঢ় বাস্তবতা যা আমাদের অস্বীকার করার উপায় নেই।” এই সংকট কাটিয়ে উঠতে বিএনপি ইতিমধ্যে সুনির্দিষ্ট কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, দলের পক্ষ থেকে আয়োজিত প্রতিটি সেমিনার বা আলোচনা সভায় এখন নূন্যতম এক ঘণ্টা সময় প্রশ্ন-উত্তর পর্বের জন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং নেতাদের জনগণের কাছে জবাবদিহি করার একটি প্রক্রিয়া।
তিনি আরও বলেন, “অতীতে আমরা কেবল মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিয়ে চলে যেতাম, সাধারণ মানুষের মনে কী আছে বা তারা আমাদের প্রস্তাবনাগুলো কতটুকু গ্রহণ করছে, তা জানার কোনো সুযোগ থাকত না। কিন্তু এখন আমরা সরাসরি জনগণের মুখোমুখি হতে চাই, যেন রাজনীতিবিদদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত থাকে এবং মানুষ তাদের ভোটাধিকারের পাশাপাশি মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে।”
দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো শক্তিশালী করতে নাগরিক সমাজ বা সিভিল সোসাইটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা। তিনি মনে করেন, কেবল সরকার বা একক কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে দেশের সামগ্রিক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, সিভিল সোসাইটিকে কেবল স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিলেই হবে না, বরং তাদের কাজের পরিবেশ সহজতর বা ফ্যাসিলিটেট করতে হবে।
আমীর খসরু বলেন, “বিএনপির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশীদারিত্বমূলক শাসনব্যবস্থা। আমরা যদি আগামীতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাই, তবে সিভিল সোসাইটি, বেসরকারি খাত (প্রাইভেট সেক্টর) এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোকে (এনজিও) সঙ্গে নিয়ে কাজ করব।”
তিনি আরও যোগ করেন যে, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, শিক্ষা কাঠামো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতে টেকসই পরিবর্তন আনতে হলে এই অংশীদারিত্ব অপরিহার্য। বিএনপির ঘোষিত রাষ্ট্রীয় সংস্কারের রূপরেখা বা ভিশন বাস্তবায়নে সমাজের প্রতিটি স্তরের প্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
সেমিনারে বক্তারা উল্লেখ করেন যে, ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রধান প্রত্যাশা হলো একটি অংশগ্রহণমূলক ও নিরপেক্ষ নির্বাচন, যেখানে তাদের মালিকানা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। আমীর খসরু বলেন, “গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণের অংশগ্রহণ। যদি আমরা একটি বৈষম্যহীন সমাজ এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামো গড়তে চাই, তবে রাষ্ট্রীয় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।”
তিনি দলীয় সিদ্ধান্তের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, বিএনপি কেবল নির্বাচনের জন্য নয়, বরং নির্বাচনের পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও একটি গুণগত পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছে। যেখানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতিটি ধাপে নাগরিক সমাজের পরামর্শ ও পর্যবেক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের এই আয়োজনে দেশের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবী, অর্থনীতিবিদ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক রওনক জাহান ও ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
এছাড়া অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তাসনিম জারা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল কাফি রতন, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এবং গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী।
আলোচনায় অংশ নিয়ে আমন্ত্রিত অতিথিরাও একমত পোষণ করেন যে, ২০২৬ সালের নির্বাচনকে সফল করতে হলে কেবল রাজনৈতিক সমঝোতা নয়, বরং নির্বাচনি প্রক্রিয়ার ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের প্রত্যাশা ও আধুনিক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাজনৈতিক দলগুলোর সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
পরিশেষে, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জোর দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে হলে দলগুলোকে কেবল ক্ষমতার রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সেবার মানসিকতা ধারণ করতে হবে। জনগণের আস্থা অর্জনের মাধ্যমেই কেবল একটি স্থিতিশীল ও উন্নত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।
