আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা ও অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হয়েছে। ভারতে অনুষ্ঠেয় এই মেগা ইভেন্টে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সর্বশেষ আহ্বান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। আজ মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) দুপুরে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ ভিডিও কনফারেন্সে বিসিবি তাদের আগের অবস্থানে অনড় থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্রিকেটারদের নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে তারা ভারতে দল পাঠাবে না।
বিসিবির পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এই বৈঠকে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম, সহ-সভাপতি শাখাওয়াত হোসেন, ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান নাজমুল আবেদীন ফাহিম এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজাম উদ্দিন চৌধুরীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। বৈঠকে বিসিবির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, বাংলাদেশের ম্যাচগুলো যেন ভারতের বাইরে কোনো নিরপেক্ষ ভেন্যুতে সরিয়ে নেওয়া হয়। অন্যদিকে, আইসিসি যুক্তি দিয়েছে যে টুর্নামেন্টের সূচি ইতিমধ্যে চূড়ান্ত হয়ে গেছে এবং এই পর্যায়ে পরিবর্তন করা কঠিন। তাই তারা বিসিবিকে তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বলেছে। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেওয়া হয়েছে।
মূলত ডিসেম্বরে আইসিসির নিরাপত্তা বিভাগের পক্ষ থেকে পাঠানো একটি অভ্যন্তরীণ চিঠির পর থেকেই এই সংকটের সূত্রপাত। সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইসিসি পুরো আসরের সার্বিক ঝুঁকিকে ‘মাঝারি’ (Moderate) হিসেবে গণ্য করলেও বাংলাদেশের জন্য এই ঝুঁকির মাত্রা ‘মাঝারি থেকে উচ্চ’ (Moderate to High) বলে উল্লেখ করেছে।
এই উদ্বেগের নেপথ্যে তিনটি প্রধান কারণ কাজ করছে। প্রথমত, ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর বাংলাদেশ বিরোধী অবস্থান। অতি সম্প্রতি আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে বাংলাদেশের তারকা পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার ঘটনাটিকে বিসিবি কেবল খেলার অংশ হিসেবে দেখছে না। বিসিবির ধারণা, উগ্রপন্থী সংগঠনের ক্রমাগত হুমকির মুখেই মুস্তাফিজকে দল ছাড়তে হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ভারতের মাটিতে বাংলাদেশি সমর্থকদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের আশঙ্কা রয়েছে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারতের সাথে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন এই নিরাপত্তাহীনতাকে আরও উসকে দিয়েছে।
পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের তিনটি ম্যাচ কলকাতায় এবং একটি ম্যাচ মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। বিসিবি মনে করছে, এই শহরগুলোতে বর্তমান পরিস্থিতিতে দলের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বিসিবির বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, “খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের জীবন বিসিবির কাছে সবথেকে বড় অগ্রাধিকার। আমরা কোনোভাবেই ঝুঁকি নিতে পারি না।”
তবে দুই পক্ষই আলোচনার পথ খোলা রেখেছে। সম্ভাব্য কোনো মধ্যস্থতা বা বিকল্প সমাধান বের করার লক্ষ্যে আইসিসি ও বিসিবি নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করবে বলে একমত হয়েছে। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের ধারণা, বিসিবি যদি শেষ পর্যন্ত অনড় থাকে, তবে আইসিসিকে হয়তো হাইব্রিড মডেলের কথা ভাবতে হতে পারে, যেমনটি গত এশিয়া কাপে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল। এখন দেখার বিষয়, আইসিসি বাংলাদেশের এই দাবি মেনে নিয়ে ভেন্যু পরিবর্তন করে কি না, নাকি বিশ্বকাপ বয়কটের মতো কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় বিসিবি।
