দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটানো এবং নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের জন্য অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় সরকার কেবল স্বল্পমেয়াদী সমাধান নয়, বরং একটি সুদূরপ্রসারী ও সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদী মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করছে। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) দুপুরে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ‘সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি’র গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।
বর্তমানে বিশ্বরাজনীতির অস্থিরতা, বিশেষ করে ভেনেজুয়েলা এবং ইরানে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন সংবাদিকরা। এর জবাবে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বিশ্ববাজারের এই অস্থিতিশীলতা আমাদের নজরে রয়েছে।
বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতির ওপর আমেরিকা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। তবে সরকার বসে নেই; দেশীয় উৎপাদন ও আমদানির ভারসাম্য বজায় রাখতে একটি বিস্তৃত প্রেজেন্টেশন ইতিমধ্যে পর্যালোচনা করা হয়েছে।
সালেহউদ্দিন আহমেদ স্পষ্ট করে বলেন, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে স্থানীয় উৎপাদন ও শিল্পায়ন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই জ্বালানি খাতের দুটি প্রধান অংশ— ‘পাওয়ার’ (বিদ্যুৎ) এবং ‘এনার্জি’ (জ্বালানি)—এই দুই ক্ষেত্রকে একীভূত করে একটি কমপ্রিহেনসিভ বা সমন্বিত পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এই পরিকল্পনার আওতায় সাগরে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য অফশোর ড্রিলিং কার্যক্রম জোরদার করা এবং বড়পুকুরিয়া ও মধ্যপাড়া খনির কয়লা ও হার্ড রক বা কঠিন শিলার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সরকার চায় নিজস্ব খনিজ সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনতে।
সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তাদের এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে যে, বর্তমান সরকারের উপদেষ্টাদের চেয়ে আমলতন্ত্র বা ব্যুরোক্রেসি বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং অধিকাংশ সিদ্ধান্ত তারাই গ্রহণ করছে। এই বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করেন।
তিনি বলেন, “আপনারা কি দেখছেন না যে কাজ হচ্ছে? অনেকে হয়তো দেখতে চাচ্ছেন না বা দেখেও সাহস করে বলতে পারছেন না। আমাদের দেশে এই ধরনের আলোচনা সবসময়ই চলে। আমরা যে শতভাগ সফল হয়ে গেছি তা দাবি করছি না; আমাদেরও কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল, প্রত্যাশা অনুযায়ী সব করতে পারিনি।”
তিনি আরও যোগ করেন যে, যেকোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সরকারি কর্মচারীদের দক্ষতা, নিষ্ঠা এবং বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য। দক্ষ জনবল এবং আন্তঃবিভাগীয় সহযোগিতা ছাড়া কেবল ইচ্ছা করলেই সব পরিবর্তন সম্ভব নয়। প্রশাসনিক কাজে গতিশীলতা আনতেও সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এদিনের ক্রয় সংক্রান্ত কমিটির বৈঠকে বেশ কিছু জনগুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— সাধারণ মানুষের ভোজ্যতেলের চাহিদা মেটাতে সয়াবিন তেল ক্রয়, কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে সার আমদানি এবং বরিশালের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর করতে একটি সেতু নির্মাণের প্রকল্প।
এছাড়া, দেশের বেকার সমস্যা সমাধান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের লক্ষ্যে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির অংশ হিসেবে ৬০ হাজার চালক প্রশিক্ষণের একটি বিশেষ প্রস্তাবেও সায় দিয়েছে কমিটি। প্রশিক্ষিত এই চালকদের পরবর্তীতে কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
বৈঠক শেষে অর্থ উপদেষ্টা পুনরায় আশ্বস্ত করেন যে, গ্যাসের সিলিন্ডার বা এলপিজি নিয়ে দেশজুড়ে যে কাজ চলছে, তার সুফল সাধারণ মানুষ দ্রুতই পাবে। জ্বালানি সংকটের দীর্ঘমেয়াদী সমাধানই এখন সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় শীর্ষে।
