বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনে যদি কেউ কোনো ধরনের ‘মেকানিজম’ বা কারচুপির পরিকল্পনা করে, তবে তারা শেষ পর্যন্ত দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, জাতি আর কোনো সাজানো বা সমঝোতার নির্বাচন মেনে নেবে না। সোমবার (১২ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র) সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক সদস্যদের সম্মানে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
জামায়াতে ইসলামী কর্তৃক আয়োজিত ‘ইন রিকগনিশন অফ সার্ভিস এন্ড সেক্রিফাইস: অ্যা স্যালুট টু আওয়ার ডিসটিংগুইশড ভেটেরানস’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে সাড়ে তিনশ থেকে চারশ সাবেক সামরিক কর্মকর্তা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট, নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং সশস্ত্র বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, জাতি আজ এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। গত ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন কোনো গণতান্ত্রিক মানদণ্ডেই পড়ে না। এর ফলে বর্তমান প্রজন্মের কয়েক কোটি তরুণ ভোটার তাদের জীবনে একবারও ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি নির্বাচন চাই যেখানে প্রতিটি ভোটার নির্ভয়ে ও স্বস্তির সাথে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবে। কোনো সমঝোতা বা মেকানিজম হবে না; বোঝাপড়া হবে কেবল রাজনৈতিক দল এবং ভোটারদের মধ্যে।”
নির্বাচন সুষ্ঠু করার লক্ষ্যে প্রতিটি বুথে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, দেশ থেকে ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। সেই তুলনায় ৫০০ বা ১০০০ কোটি টাকা খরচ করে স্বচ্ছ নির্বাচনী ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অসম্ভব কিছু নয়। তিনি আরও বলেন, “নির্বাচন কমিশন এবং সরকারের দায়িত্ব জনগণের পছন্দের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা। যদি তারা তা করতে না পারেন, তবে তাদের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানো উচিত। দায়িত্ব নিয়ে কাজ না করা কেবল অবহেলা নয়, এটি কর্তব্যের চরম লঙ্ঘন।”
শহীদ জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণার প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমির বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কোনো বেসামরিক ব্যক্তির মুখ দিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারিত হয়নি, হয়েছে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের কণ্ঠেই। তিনি বলেন, “এটি ইতিহাসের অমোঘ সত্য। এই অবদানকে যারা ম্লান করতে চায়, তারা মূলত নিজেদের পরিচয়কেই অস্বীকার করে। রাজনীতিবিদরা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছিলেন বলেই তখন একজন সেনা কর্মকর্তাকে এগিয়ে আসতে হয়েছিল।”
তিনি আরও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জেনারেল আতাউল গনি ওসমানীর মতো বীরদের অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি আসম আব্দুর রবের নামও ঠিকমতো উচ্চারিত হয় না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যিনি স্বাধীনতার পতাকা প্রথম উত্তোলন করেছিলেন, তার অবদান স্বীকার না করলে ভবিষ্যতে দেশে আর কোনো বীরের জন্ম হবে না।” চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্বশীল অবস্থানের কারণেই দেশ সেবার এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ থেকে রক্ষা পেয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে বিচারহীনতার সংস্কৃতির সমালোচনা করে বলেন, এক মুক্তিযোদ্ধার মেয়েকে হত্যার প্ররোচনার বিচার আজও ঝুলে আছে। তিনি দুর্নীতির মূলোৎপাটন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, “আমরা দুর্নীতির ল্যাজ ধরে নয়, কান ধরে টান দিতে চাই। জামায়াত নিজেরা দুর্নীতি করবে না এবং কাউকে দুর্নীতি করতেও দেবে না। আমরা সিংহের মতো গর্জন তুলে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই।”
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে বলেন, “তোমরা এবার ভোট দেবে, আমরা সেই ভোট পাহারা দেব। তোমরা হবে জাতির পাহারাদার।” তিনি অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, পরবর্তী প্রজন্মের হাতে একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ দেশ তুলে দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় কাজ।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন মেজর জেনারেল মাহবুব উল আলম ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা হাসিনুর রহমান। জামায়াতের ঢাকা-১৬ আসনের প্রার্থী আব্দুল বাতেনের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কর্নেল (অব.) মো. জাকারিয়া হোসেন। অনুষ্ঠানে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দসহ বিপুল সংখ্যক সাবেক সামরিক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
