২০১৮ সালের ‘মিডনাইট ইলেকশন’ বা মধ্যরাতের নির্বাচনের মতো কোনো প্রহসন যদি এবারও মঞ্চস্থ হয়, তবে তার জন্য পুরো জাতিকে চড়া মূল্য দিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, একটি প্রত্যাশিত ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ যদি এবার হাতছাড়া হয়ে যায়, তবে দেশের ভবিষ্যৎ এক গভীর সংকটের মুখে পড়বে। আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর বসুন্ধরায় নিজ কার্যালয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা জানান।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ও ইইউ প্রতিনিধি দলের প্রধান ইভারস আইজাবসের নেতৃত্বে তিন সদস্যের এই প্রতিনিধি দলের সঙ্গে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেন জামায়াত নেতৃবৃন্দ। বৈঠক শেষে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা মনে করি এবার ২০১৮ সালের মতো কোনো পরিবেশ তৈরি হবে না এবং তেমন কিছু হতে দেওয়াও উচিত নয়। যে কোনো মূল্যে এবারের নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে হবে। যদি আবারও নির্বাচনের নামে প্রহসন হয়, তবে জাতিকে কতোটা ভয়াবহ পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে তা অকল্পনীয়।”
নির্বাচন বর্জনের কোনো সম্ভাবনা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির স্পষ্ট করে বলেন, “জামায়াতে ইসলামী বরাবরই প্রতিটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। আমরা কেবল ২০১৮ সালের নির্বাচনটি মাঝপথে বর্জন করেছিলাম, কারণ দুপুরের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে সেটি আসলে কোনো নির্বাচনই ছিল না। এবার আমরা আশা করছি তেমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে না।”
নির্বাচনে সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট কিছু চ্যালেঞ্জ ও অভিযোগ অবশ্যই আছে। তবে সেগুলো এখনই বিদেশি প্রতিনিধিদের কাছে প্রকাশ না করে প্রথমে নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। যদি তারা সমাধানে ব্যর্থ হয়, তবেই দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তা অবহিত করা হবে।
বৈঠকে আগামীতে জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠন করলে বৈদেশিক সম্পর্কের বিশেষ করে প্রতিবেশীদের সঙ্গে আচরণ কেমন হবে, তা জানতে চান ইইউ প্রতিনিধিরা। এর উত্তরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকতে চাই না। বিশ্বের সকল শান্তিকামী ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক থাকবে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে। আমরা প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করব এবং তাদের কাছ থেকেও একই আচরণ প্রত্যাশা করি।”
দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গত ৫৪ বছরের রাজনীতি দেখে দেশের মানুষ ক্লান্ত ও হতাশ। তারা এখন আমূল পরিবর্তন চায়। তিনি অভিযোগ করেন যে, নির্বাচনী প্রচারণায় নারীদের বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং এমনকি হিজাব খুলে নেওয়ার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনাও ঘটছে। তিনি সকল রাজনৈতিক দলকে সব শ্রেণি ও লিঙ্গের মানুষের প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানান। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এর জবাবদিহিতা ও ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা সংস্কার প্রস্তাবের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে জামায়াত আমির দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমরা সংস্কারের পক্ষে, তাই আমরা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে।
আপনারা যাকে খুশি ভোট দিন, কিন্তু দেশের টেকসই সংস্কারের স্বার্থে গণভোটে অবশ্যই ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবেন।” সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, কতিপয় মূলধারার গণমাধ্যম একটি নির্দিষ্ট পক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, যা কাম্য নয়। গণমাধ্যমকে সমাজের ‘বিবেক’ হিসেবে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের পরামর্শ দেন তিনি।
বৈঠকে জামায়াত আমিরের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, শিক্ষাবিদ ড. যুবায়ের আহমেদ, উন্নয়ন টিম লিড দেওয়ান আলমগীর এবং আমিরের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মাহমুদুল হাসান। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আসন্ন সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে তাদের প্রায় ২০০ সদস্যের একটি বিশাল প্রতিনিধি দল মাঠে থাকবে।
