দেশের ব্যাংকিংখাত বর্তমানে ইতিহাসে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের (Non-Performing Loan – NPL) পাহাড়সম বোঝা নিয়ে এক নজিরবিহীন সংকটকাল অতিক্রম করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকাই খেলাপি, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এই হার ১৯৯৯ সালের পর সর্বোচ্চ (১৯৯৯ সালে ছিল রেকর্ড ৪১.১০ শতাংশ)। এই ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের পটভূমিতেই আসছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যাকে ব্যাংকার ও নীতিনির্ধারকেরা ঐতিহ্যগতভাবে ‘ঋণ আদায় মৌসুম’ হিসেবে বিবেচনা করেন। তবে প্রশ্ন উঠেছে, অতীতের মতো এবারও কি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং আইনি শিথিলতা এই সুযোগকে ব্যর্থ করে দেবে?
বাংলাদেশ আজ বিশ্বজুড়ে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের হারের তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করছে। দীর্ঘ যুদ্ধে বিধ্বস্ত ইউক্রেন (২৬.১০%), লেবানন (২৩.৮০%), কিংবা অর্থনৈতিক সংকটে থাকা শ্রীলঙ্কা (১২.৬০%)—এদের সবার চেয়ে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের হার (৩৫.৭৩%) বেশি। এই অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতির প্রধান দুটি কারণ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে:
১. তথ্য গোপন: ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে পর্যন্ত অনেক ঋণ আদায় না হলেও তা নিয়মিত ঋণ হিসেবে দেখানো হতো, যার ফলে খেলাপি ঋণের তথ্য দীর্ঘদিন ধরে গোপন ছিল। ২. নীতিমালা পরিবর্তন: চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত নতুন নীতিমালা কার্যকর হয়েছে। এই নীতিমালা অনুসারে কোনো ঋণ বা ঋণের কিস্তি মাত্র তিন মাস বকেয়া থাকলেই তা খেলাপি তালিকাভুক্ত হবে, যেখানে আগের নীতিমালায় নয় মাস বকেয়া থাকার সুযোগ ছিল। এই কঠোরতা বিপুল পরিমাণ লুকানো ঋণকে প্রকাশ্যে এনেছে। এক বছরের ব্যবধানেই (সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৫) খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুসারে, ঋণখেলাপি কোনো ব্যক্তি নির্বাচনের প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হন। প্রার্থী স্বয়ং, মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, পরিচালক পদে থাকা কোনো ফার্ম বা কোম্পানির ঋণ এবং জামানত দেওয়া ঋণ খেলাপি হলে তার মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়।
১৯৯১ সালের সংশোধনীতে ‘আরপিও-১৯৭২’-এর ১২(১) অনুচ্ছেদের (ঠ) ও (ড) উপধারায় এই বিধান যুক্ত করা হয়। ২০০৮ সালের সংশোধনীতে (১২(১) অনুচ্ছেদের ‘ঠ’ ও ‘ড’ উপধারা) আরও স্পষ্ট করে বলা হয় যে, ক্ষুদ্র কৃষি ঋণ (সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা) ব্যতীত অন্য কোনো ঋণ খেলাপিরা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে (সিআইবি) খেলাপি হিসেবে তালিকাভুক্ত হলে তিনি ঋণ খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হবেন। চলতি ২০২৫ সালের সংশোধিত আরপিওতেও এই বিধান বহাল রয়েছে।
তাত্ত্বিকভাবে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর মনোনয়নপত্র দাখিলের সময়সীমা ঋণখেলাপি রাজনীতিবিদদের ওপর ঋণ পরিশোধের জন্য তীব্র চাপ সৃষ্টি করে। এটাই ব্যাংকগুলোর পাওনা আদায়ের একমাত্র শক্তিশালী আইনি সুযোগ।
ইতিহাস কিন্তু বলে, এই আইনি অস্ত্র প্রায়শই কার্যকর হয় না। ১৯৯১ সালের পর থেকে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতেও এই আইন বিদ্যমান ছিল, তবুও সাবেক মন্ত্রী ও এমপিদের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ পুঞ্জিভূত হয়েছে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একটি ঘটনা এখানে উদাহরণ হিসেবে দেওয়া যায়: তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের একজন সংসদ সদস্য আ স ম ফিরোজ সোনালী ব্যাংকের ২৬ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ থাকায় হাইকোর্ট কর্তৃক তার মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালত সেই বাতিল আদেশ বাতিল করে ওই খেলাপি ঋণকে নবম বারের মতো পুনঃতফসিল করার আদেশ দেন। যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুসারে একজন গ্রাহকের খেলাপি ঋণ সর্বোচ্চ তিনবার পুনঃতফসিল করা যায়, সেখানে আদালতের আদেশে তিনি ঋণের টাকা ফেরত প্রদান না করেই ‘খেলাপি’ তকমামুক্ত হয়ে নির্বাচনে অংশ নেন এবং জয়লাভ করেন। ঋণের টাকা পরিশোধ না করেই আদালতের আদেশে খেলাপির তকমামুক্ত হয়েছেন—এমন নজির অহরহ। রাষ্ট্রীয়ভাবে ঋণখেলাপিদের এভাবে পৃষ্ঠপোষকতার মাশুল দেশের ব্যাংকিংখাতকে দিতে হচ্ছে।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঋণ আদায়ের এই সুযোগকে কার্যকরভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ নীতিসহায়তা। গত ২৪ নভেম্বর জারি করা প্রজ্ঞাপনে ঋণ খেলাপিদের জন্য নজিরবিহীন শিথিলতা দেওয়া হয়েছে।
মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট প্রদান করে খেলাপি ঋণ আগামী ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিল করা যাবে।
৩০ নভেম্বর তারিখে খেলাপিভুক্ত ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আবেদন করা যাবে—যা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
প্রার্থীরা আগামী ২ বছর গ্রেস পিরিয়ড সুবিধা অর্থাৎ কিস্তি পরিশোধ থেকে বিরতি পাবেন।
এই ‘নীতিসহায়তা’ স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচনে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক ঋণ খেলাপিদের মোটা অঙ্কের কিস্তি পরিশোধ থেকে অব্যাহতি দেবে। তারা সহজেই মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়েই ঋণখেলাপির তালিকা থেকে নিজেদের নাম মুক্ত করতে পারবেন এবং আইনিভাবে নির্বাচনের জন্য যোগ্য হবেন।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সিআইবি রিপোর্ট সঠিকভাবে প্রয়োগ করার জন্য ব্যাংকগুলোর প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হলেও, এই নরম নীতিমালার কারণে ঋণ আদায় মৌসুম কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়বে। এরপরও ঐতিহ্য অনুসারে উচ্চ আদালতের দরজা সকলের জন্য খোলা থাকবে, যেখানে স্থগিতাদেশ নিয়ে ঋণ পরিশোধ না করেই প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বিদ্যমান।
বর্তমানে অনেক ব্যাংকের গ্রাহকবৃন্দ তাদের আমানতের টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। কারণ ওই সব ব্যাংকের ঋণগ্রহীতারা পাওনা পরিশোধ না করে গাঢাকা দিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে, ঋণ আদায় মৌসুমকে কাজে লাগিয়ে ব্যাংকগুলো ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে, নাকি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও চিরাচরিত আইনি প্রতিবন্ধকতায় এবারের মৌসুমও ব্যর্থ হবে—সময়ই সেই উত্তর বলে দেবে। দেশের অর্থনীতির জন্য এই সময়টি একটি গুরুতর অগ্নিপরীক্ষা।
