বাংলা সংগীত ও নাট্যজগতের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব তাহসান খান বর্তমানে তার ব্যক্তিগত জীবনের এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও প্রতিকূল সময় পার করছেন। মেকআপ আর্টিস্ট রোজা আহমেদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে বিচ্ছেদের গুঞ্জন এবং আলাদা থাকার খবর নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মাঝে তাকে নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে জনসম্মুখ থেকে কিছুটা দূরে থাকা এই শিল্পী অবশেষে সংবাদমাধ্যমের কাছে নিজের বর্তমান মানসিক অবস্থা, দৈনন্দিন জীবন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে এক নিঃসঙ্গ কিন্তু ধৈর্যশীল পথচলার প্রতিচ্ছবি, যেখানে তিনি নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
দীর্ঘদিন ধরেই তাহসান খান ও রোজা আহমেদের সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে বিনোদন পাড়ায় নানা আলোচনা চলছিল। সম্প্রতি তারা আনুষ্ঠানিকভাবে আলাদা থাকার বিষয়টি স্বীকার করে নিলে সেই জল্পনার অবসান ঘটে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাহসান কোথায় আছেন এবং কীভাবে সময় অতিবাহিত করছেন, তা নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। এই বিষয়ে শিল্পীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তাহসান জানান, বর্তমানে তিনি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে একাকী ভ্রমণ করে সময় কাটাচ্ছেন। কোলাহলমুক্ত পরিবেশে নিজেকে মানসিকভাবে শান্ত রাখতেই তার এই নিরন্তর পথচলা। জীবনের এই সন্ধিক্ষণে তিনি একাকীত্বকে ভয় না পেয়ে বরং একে আত্মোপলব্ধির মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
ভ্রমণের পাশাপাশি বই পড়াকেই এই মুহূর্তে নিজের প্রধান অবলম্বন হিসেবে বেছে নিয়েছেন তাহসান। তার ভাষ্যমতে, এই কঠিন সময়ে বই-ই তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন ঘরানার সাহিত্যের মাঝে তিনি জীবনের গভীরতর দর্শন এবং প্রশান্তি খুঁজছেন। সংগীত ও অভিনয়ের ব্যস্ত শিডিউল থেকে দূরে থেকে তিনি এখন কেবল নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি মনোযোগ দিচ্ছেন। তবে কেবল মানসিক চাপ নয়, শারীরিক অসুস্থতাও তাকে বেশ ভোগাচ্ছে বলে জানা গেছে। গত কিছুদিন ধরে তিনি শারীরিকভাবেও বেশ অসুস্থ বোধ করছেন, যা তার দৈনন্দিন স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। শারীরিক এই অসুস্থতার সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে এখনই বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করতে অনীহা প্রকাশ করেছেন তিনি। শারীরিক ও মানসিক ধকলের কারণেই সরাসরি ফোনে কথা বলার পরিবর্তে তিনি বর্তমানে ডিজিটাল মাধ্যম তথা হোয়্যাটসঅ্যাপে বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন।
তাহসান খানের এই নিভৃতবাস এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরত্ব বজায় রাখার সিদ্ধান্তটি অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত মনে হলেও, তার ঘনিষ্ঠজনরা মনে করছেন এটি তার ব্যক্তিগত পুনর্গঠনের একটি অংশ। সংগীত ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই তিনি অত্যন্ত পরিশীলিত এবং মার্জিত আচরণের জন্য পরিচিত। জীবনের এই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়েও তিনি সেই গাম্ভীর্য বজায় রেখেছেন। কোনো প্রকার বিতর্ক বা পাল্টাপাল্টি অভিযোগে না গিয়ে তিনি পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন অত্যন্ত ধৈর্য ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে। তার জীবনসঙ্গিনী রোজা আহমেদের পক্ষ থেকে সম্মান ও বিশ্বাসের যে দাবি ইতিপূর্বে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে তাহসানের এই নিরবতা ও সংযত আচরণ তার ব্যক্তিত্বের এক ভিন্ন দিক উন্মোচিত করেছে।
সময়ের সাথে সাথে তাহসানের সংগীত ও অভিনয়ের জগত থেকে সাময়িক এই দূরত্ব তার ভক্তদের মনে শূন্যতা তৈরি করেছে। তবে শিল্পী মনে করেন, সৃজনশীল মানুষের জীবনে বিরতি একান্ত প্রয়োজন, বিশেষ করে যখন ব্যক্তিগত জীবনের ঝড় সবকিছুকে ওলটপালট করে দেয়। বর্তমানে তিনি কোনো নতুন গানে কণ্ঠ দেওয়া বা নাটকের শুটিংয়ে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন না। বরং নিজেকে সুস্থ করে তোলা এবং মানসিকভাবে স্থির হওয়াই তার প্রধান লক্ষ্য। তিনি বিশ্বাস করেন, সঠিক সময়ে তিনি আবার পূর্ণ উদ্যমে তার শ্রোতা ও দর্শকদের মাঝে ফিরে আসবেন। তবে সেই ফেরার আগে নিজেকে তৈরি করার জন্য তিনি এই নির্জনতাকে আশীর্বাদ হিসেবে দেখছেন।
বার্তালাপের একপর্যায়ে তাহসান খান অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে সকলের কাছে দোয়া প্রার্থনা করেছেন। তিনি চান তার এই কঠিন ও অনিশ্চিত সময়টি যেন দ্রুত অতিবাহিত হয় এবং তিনি আবার স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তন করতে পারেন। তিনি তার অগণিত ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে অনুরোধ করেছেন যেন তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে সম্মান জানানো হয়। মানুষের জীবনের উত্থান-পতন চিরন্তন সত্য, আর সেই সত্যকে মেনে নিয়েই তিনি আগামীর পথে পা বাড়াচ্ছেন। একজন সফল শিল্পী হিসেবে তিনি যেভাবে এতদিন মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন, জীবনের এই ধূসর সময়েও সেই ভালোবাসাই তাকে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি যোগাবে বলে তিনি মনে করেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর মানদণ্ড অনুযায়ী, সেলিব্রিটিদের ব্যক্তিগত জীবনের সংকট কেবল খবরের বিষয় নয়, বরং এটি তাদের মানবিক সংবেদনশীলতার একটি বহিঃপ্রকাশ। তাহসান খানের বর্তমান অবস্থা ঠিক তেমনই একটি দৃষ্টান্ত, যেখানে খ্যাতি ও সাফল্যের আড়ালে থাকা একজন রক্ত-মাংসের মানুষের জীবনযুদ্ধ ফুটে উঠেছে। তার এই নিঃসঙ্গ পথচলা এবং অসুস্থতার খবর বিনোদন অঙ্গনে এক ধরনের বিষণ্ণতা তৈরি করলেও, সবাই আশা করছেন দ্রুতই মেঘ কেটে যাবে এবং তাহসান তার চিরচেনা হাসিমুখে পুনরায় শিল্পাঙ্গনে মুখর হয়ে উঠবেন। আপাতত বই আর ভ্রমণের মাঝেই খুঁজে ফিরছেন তিনি তার ফেলে আসা প্রশান্তি, যা তাকে এক নতুন ভোরের দিকে নিয়ে যাবে।
