ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে দলবদলের পর বাগযুদ্ধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। কলকাতার জনপ্রিয় অভিনেত্রী রূপাঞ্জনা মিত্র সম্প্রতি দেশটির কেন্দ্রীয় ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) ‘ইংরেজের দালাল’ এবং ‘ফ্যাসিস্ট’ বা স্বৈরাচারী বলে নজিরবিহীন আক্রমণ চালিয়েছেন। একসময় বিজেপির আদর্শের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে রাজনৈতিক শিবির পরিবর্তন করে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন এই তারকা। দল পরিবর্তনের ঠিক পরপরই সামাজিক মাধ্যমে তার এই কঠোর অবস্থান পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
রূপাঞ্জনা মিত্র তার ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি সুদীর্ঘ বার্তার মাধ্যমে বিজেপির কড়া সমালোচনা করেন। সেখানে তিনি গুজরাটের দাঙ্গা থেকে শুরু করে বর্তমান দিল্লির শাসনব্যবস্থা—সবকিছু নিয়ে নিজের ক্ষোভ উগরে দেন। অভিনেত্রী লেখেন, ইতিহাসের পাতায় রক্তমাখা অধ্যায়গুলো সাধারণ মানুষ ভুলে যায়নি। ধর্মের দোহাই দিয়ে যে বিভেদ সৃষ্টি করা হয়েছে, তা আজ ক্ষমতার শীর্ষে বসে শাসন করছে। তিনি আরও দাবি করেন, তথাকথিত ‘কলাটারাল ড্যামেজ’ বা সাধারণ মানুষের প্রাণহানির বিনিময়ে অর্জিত ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হলেও তার নৈতিক ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল।
বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রসঙ্গ টেনে রূপাঞ্জনা তার বার্তায় উল্লেখ করেন যে, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ঐতিহাসিকভাবেই অত্যন্ত মানবিক এবং দায়িত্বশীল। এ অঞ্চলের মানুষ সব ধর্ম, বর্ণ ও ভাষার মানুষের সঙ্গে সহাবস্থান করতে জানে এবং প্রতিটি ধর্মীয় উৎসবকে সমান মর্যাদা দিয়ে উদ্যাপন করে। তিনি পরোক্ষভাবে বিজেপির উগ্র জাতীয়তাবাদের সমালোচনা করে জানান, এই ভিন্ন ধারার রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পেরে তিনি আজ স্বস্তি বোধ করছেন। তার মতে, ব্রিটিশ শাসনামলে যেভাবে ‘ভাগ করো এবং শাসন করো’ নীতি প্রয়োগ করা হতো, বর্তমানে কেন্দ্রীয় শাসকদল ঠিক সেই একই পথ অনুসরণ করছে।
অভিনেত্রীর এই আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ব্রিটিশ আমলের বিভাজন রাজনীতির সাথে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা। তিনি অভিযোগ করেন, বিজেপি সমাজজুড়ে এক প্রকার ত্রাস বা ভীতি সৃষ্টি করতে চায়, যাতে তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা সুসংহত হয়। তিনি তাদের মানসিকতাকে ‘স্যাডিস্ট’ বা পরশ্রীকাতর এবং ‘ফ্যাসিস্ট’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তীব্র ধিক্কার জানান। মূলত রাজনৈতিক আদর্শের বিশাল ব্যবধানের কারণেই তিনি আগের দল ত্যাগ করেছেন বলে তার লেখায় স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
রূপাঞ্জনা মিত্রের এই মন্তব্যের নেপথ্যে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি। সম্প্রতি তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, তাদের নির্বাচনী কৌশল এবং প্রার্থী তালিকা সংক্রান্ত গোপনীয়তা নষ্ট করার চেষ্টা চালাচ্ছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলো। এই অভিযোগের প্রতিবাদে গত ৯ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুর থেকে হাজরা পর্যন্ত এক বিশাল প্রতিবাদ মিছিল করেন। উক্ত মিছিলে টালিউডের অসংখ্য তারকা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন, যেখানে রূপাঞ্জনার উপস্থিতিও ছিল লক্ষ্যণীয়। সেই কর্মসূচির রেশ ধরেই তিনি সামাজিক মাধ্যমে দলটির বিরুদ্ধে এমন আক্রমণাত্মক অবস্থান নিলেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রূপাঞ্জনার এই আক্রমণ কেবল তার ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন রাজনৈতিক সমীকরণের একটি বড় অংশ। অভিনয়ের পাশাপাশি রাজনীতিতেও সক্রিয় এই অভিনেত্রীর এমন মন্তব্য সাধারণ ভোটারদের ওপর কতটুকু প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এই মুহূর্তে তার দেওয়া ‘ইংরেজের দালাল’ এবং ‘ফ্যাসিস্ট’ তকমাটি যে ভারতীয় রাজনীতির উত্তাপ বাড়িয়ে দিয়েছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
