দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ক্যামেরার সামনে গড়িয়েছে ঢাকাই চলচ্চিত্রের শীর্ষ নায়ক শাকিব খানের নতুন সিনেমা ‘প্রিন্স’। দেশীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম ব্যয়বহুল এই সিনেমাটির কাজ আজ মঙ্গলবার থেকে রাজধানী ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সিনেমাটি নিয়ে বিনোদন অঙ্গনে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল, শুটিং শুরুর মাধ্যমে তার অবসান ঘটল।
বিশেষ করে বিদেশের লোকেশনে শুটিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ভিসা পেতে বিলম্ব হওয়ায় চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট অনেকের মনেই সংশয় তৈরি হয়েছিল যে, সিনেমাটির কাজ সঠিক সময়ে শুরু হবে কি না। তবে সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে আজ থেকে শুটিং ইউনিটের ব্যস্ততা শুরু হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
সিনেমাটির নির্মাণ কাজ শুরুর বিষয়টি সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন এর পরিচালক আবু হায়াত মাহমুদ। তিনি জানান, আজ থেকে ঢাকায় প্রাথমিক পর্যায়ের দৃশ্যধারণ শুরু হলেও চিত্রনায়ক শাকিব খান আগামী সপ্তাহ থেকে শুটিংয়ে যোগ দেবেন। বর্তমানে ঢাকায় চারদিনের একটি সংক্ষিপ্ত শিডিউল নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে সিনেমার গল্পের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিকোয়েন্স ধারণ করা হচ্ছে। ঢাকার কাজ শেষ হওয়ার পরপরই সিনেমার পুরো ইউনিট দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপ রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার উদ্দেশ্যে রওনা হবে। সেখানে একটি দীর্ঘ এবং গুরুত্বপূর্ণ শিডিউল রাখা হয়েছে, যেখানে সিনেমার মূল গল্পের একটি বড় অংশ এবং অ্যাকশন দৃশ্যগুলো চিত্রায়িত হওয়ার কথা রয়েছে।
সিনেমাটি নিয়ে আলোচনার শুরু থেকেই একটি বিশেষ গুঞ্জন চলচ্চিত্র পাড়ায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। গুঞ্জন ছিল যে, নব্বই দশকের ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত অপরাধী ‘কালা জাহাঙ্গীর’-এর জীবনের ছায়া অবলম্বনে ‘প্রিন্স’ সিনেমার চিত্রনাট্য তৈরি হয়েছে। তবে এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও স্রেফ গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন পরিচালক আবু হায়াত মাহমুদ। তিনি জানান, সিনেমাটির গল্প এবং চরিত্রগুলো সম্পূর্ণ মৌলিক এবং এর সঙ্গে বাস্তব কোনো অপরাধীর জীবনের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। মূলত একটি বাণিজ্যিক ধারার পরিচ্ছন্ন চলচ্চিত্র উপহার দেওয়াই তাদের লক্ষ্য, যেখানে অ্যাকশন, রোমান্স এবং পারিবারিক আবহের একটি সুষম সমন্বয় থাকবে।
প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ক্রিয়েটিভ ল্যান্ড ফিল্মসের ব্যানারে নির্মিত এই সিনেমাটির কাস্টিংয়ে রয়েছে বিশাল চমক। শাকিব খানের পাশাপাশি এই সিনেমায় দেখা যাবে দুই বাংলার একঝাঁক প্রতিভাবান ও জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পীকে। নারী প্রধান চরিত্রে এবার শাকিব খানের সঙ্গে জুটি বেঁধে পর্দায় আসছেন কলকাতার আলোচিত অভিনেত্রী জ্যোতির্ময়ী কুণ্ডু। একইসঙ্গে বাংলাদেশের ছোট পর্দার বর্তমান সময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় দুই মুখ তাসনিয়া ফারিণ ও সাবিলা নূর এই সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করছেন। তিন জন দাপুটে অভিনেত্রীর উপস্থিতি সিনেমাটির গল্পে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অভিনয়শিল্পী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্মাতা কোনো আপস করেননি, যা সিনেমাটির শক্তিশালী কাস্টিং দেখলেই বোঝা যায়। পার্শ্ব চরিত্রে থাকছেন অত্যন্ত শক্তিমান কিছু অভিনয়শিল্পী, যারা তাদের অভিনয়ের মাধ্যমে ইতিমধ্যে নিজেদের জাত চিনিয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান সময়ের তুখোড় অভিনেতা নাসির উদ্দিন খান, রাশেদ মামুন অপু এবং ইন্তেখাব দিনারের মতো তারকারা। এছাড়াও হাস্যরসের ভিন্ন মাত্রা যোগ করতে থাকছেন প্রবীণ অভিনেতা ডা. এজাজ এবং প্রতিশ্রুতিশীল অভিনেতা শরীফ সিরাজসহ আরও অনেকে। এই বিশাল তারকার সমাগম ‘প্রিন্স’ সিনেমাটিকে ঘিরে দর্শকদের আগ্রহ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সিনেমাটির প্রযোজক শিরিন সুলতানা জানান, ‘প্রিন্স’ একটি আন্তর্জাতিক মানের সিনেমা হিসেবে নির্মিত হতে যাচ্ছে। কারিগরি দিক থেকে শুরু করে গল্প বলা—সবক্ষেত্রেই একটি আধুনিক ছাপ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। বর্তমান সময়ে ঢাকাই সিনেমার যে জোয়ার চলছে, সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এবং দর্শকদের বিশ্বমানের বিনোদন দিতেই এই বিশাল বাজেটের সিনেমা নির্মাণের ঝুঁকি নেওয়া হয়েছে। শ্রীলঙ্কার চোখ ধাঁধানো লোকেশনে চিত্রায়িত গান এবং অ্যাকশন দৃশ্যগুলো দর্শকদের জন্য বাড়তি পাওনা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, শাকিব খান বর্তমানে তার ক্যারিয়ারের এক অনন্য উচ্চতায় অবস্থান করছেন। তার আগের কয়েকটি সিনেমা ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি প্রশংসিত হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে ‘প্রিন্স’ সিনেমাটি তার ক্যারিয়ারে আরও একটি সাফল্যের পালক যোগ করতে পারে। বিশেষ করে তাসনিয়া ফারিণ ও সাবিলা নূরের মতো অভিনয়প্রধান শিল্পীদের এই প্রজেক্টে যুক্ত করাকে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন অনেকে। এতে করে সিনেমার আবেদন যেমন সাধারণ দর্শকদের কাছে বাড়বে, তেমনি রুচিশীল দর্শকদেরও হলমুখী করার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
উল্লেখ্য, ঢাকাই সিনেমা বর্তমানে তার স্বর্ণালি অতীত ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে লিপ্ত। বড় বাজেটের মৌলিক সিনেমা এবং আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি সহায়তা এই যাত্রাকে আরও বেগবান করছে। ‘প্রিন্স’ সিনেমার শুটিং ঘিরে যে বিশাল পরিকল্পনা এবং আয়োজনের খবর পাওয়া যাচ্ছে, তা বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।
ভিসা জটিলতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিকূলতা কাটিয়ে শুটিং ফ্লোরে ফেরা এই সিনেমাটি আগামী ঈদে বা বড় কোনো উৎসবে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে। আপাতত ঢাকার রাজপথ এবং অলিগলি পেরিয়ে ক্যামেরা যখন শ্রীলঙ্কার নীল সমুদ্রে পৌঁছাবে, তখন ‘প্রিন্স’-এর আসল রূপ আরও পরিষ্কার হবে। দর্শকদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শাকিব খানের রাজকীয় এই প্রত্যাবর্তন দেশের চলচ্চিত্র শিল্পে নতুন কোনো ইতিহাস গড়ে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
