ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের এক দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নর, দেশের প্রভাবশালী সিকদার গ্রুপের মালিকপক্ষ এবং ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। জাল নথিপত্র ব্যবহার করে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির অকাট্য প্রমাণ পাওয়ার পর আজ রোববার দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সংস্থাটির মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, আসামিরা ক্ষমতার অপব্যবহার এবং পরস্পর যোগসাজশে অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে একটি বেসরকারি ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের পর আজ দাপ্তরিকভাবে মামলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
অভিযুক্তদের তালিকায় যারা রয়েছেন: দুদকের এই মামলার তালিকায় হেভিওয়েট ব্যক্তিদের নাম উঠে এসেছে। উল্লেখযোগ্য আসামিরা হলেন: ড. মো. কবির আহাম্মদ: বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান ডেপুটি গভর্নর (ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক পর্যবেক্ষক)। সিকদার পরিবার: সাবেক পরিচালক মনোয়ারা সিকদার, পারভীন হক সিকদার ও রন হক সিকদার।
ন্যাশনাল ব্যাংকের কর্মকর্তা: সাবেক এমডি চৌধুরী মোসতাক আহমেদ, ডিএমডি আরিফ মো. শহীদুল হকসহ আরও বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা। অন্যান্য: সিকদার গ্রুপের জন হক সিকদার এবং বেশ কয়েকটি ঠিকাদারি ও কনস্ট্রাকশন প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারবৃন্দ।
দুর্নীতির নেপথ্যে যা ঘটেছে: দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, আসামিরা ভুয়া ‘ওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট’ বা কাজের চুক্তিপত্র তৈরি করে ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ৬০০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করিয়ে নেন। পরবর্তীতে সেই ঋণের অর্থ নিয়মবহির্ভূতভাবে নগদ টাকা, পে-অর্ডার এবং ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নেওয়া হয় (মানিলন্ডারিং)।
দীর্ঘদিন ঋণের আসল অর্থ পরিশোধ না করায় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সুদ ও অন্যান্য চার্জ মিলিয়ে ব্যাংকের পাওনার পরিমাণ দাঁড়ায় আরও ৩০৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯০৩ কোটি ৬৭ লাখ ২ হাজার ৬২১ টাকা।
আইনি পদক্ষেপ: আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০ (প্রতারণা), ৪০৯ (বিশ্বাসভঙ্গ), ৪৬৭ ও ৪৭১ (জালিয়াতি) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলা দায়ের করা হচ্ছে। শীঘ্রই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে থানায় এই এফআইআর (FIR) দায়ের করা হবে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ও জালিয়াতি নিয়ে যখন দেশজুড়ে আলোচনা চলছে, তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ ও মামলা দেশের আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলাকেই ফুটিয়ে তুলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
