আসন্ন নির্বাচনের জন্য একটি সহিংসতামুক্ত এবং অবাধ পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার বার্ষিক অধিবেশনে গৃহীত এক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবে অবিলম্বে দেশের সকল অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর তালিকা তৈরি করে তাদের গ্রেপ্তার করা এবং সমস্ত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবি জানানো হয়েছে। জামায়াতের এই দাবি এমন এক সময়ে এলো, যখন দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের নেতাকর্মীদের ওপর প্রতিপক্ষ দলের পক্ষ থেকে হামলার অভিযোগ উঠছে, যা নির্বাচনকালীন সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
শনিবার (২৯ নভেম্বর) মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার এই বার্ষিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে এই অধিবেশনে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর পর্যালোচনা করা হয়। অধিবেশন শেষে দলের কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের সিনিয়র প্রচার সহকারী মুজিবুল আলম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে শূরার সিদ্ধান্ত ও দাবিগুলো বিস্তারিতভাবে জানানো হয়। মজলিসে শূরার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই ধরনের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে জনগণের মধ্যে নির্বাচনের প্রতি আস্থা তৈরি হবে না এবং নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার অধিবেশনে গত কিছুদিন ধরে তাদের নেতাকর্মীদের ওপর সংঘটিত হামলাগুলোর বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বিশেষ করে গত ২৭ নভেম্বর পাবনা জেলার ঈশ্বরদীতে জামায়াতের একটি শান্তিপূর্ণ মিছিলে প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর কর্মীদের হামলার অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে আলোচনা করা হয়। জামায়াতের দাবি অনুযায়ী, বিএনপির সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের ধারালো অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এই হামলা চালায়। এই হামলায় জামায়াতে ইসলামীর ৬০ থেকে ৭০ জন নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়, যাদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক।
দলটির পক্ষ থেকে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে যে, ঈশ্বরদীর এই হামলার সময় স্থানীয় থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পক্ষপাতিত্ব করেছেন এবং আক্রান্ত জামায়াত কর্মীদের রক্ষায় যথাযথ ভূমিকা পালন করেননি। এই ধরনের পক্ষপাতমূলক আচরণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বলে মজলিসে শূরা অভিমত ব্যক্ত করেছে।
ঈশ্বরদীর ঘটনা ছাড়াও, জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা উল্লেখ করেছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অন্যান্য জেলাগুলোতেও তাদের নেতাকর্মীরা নিয়মিত হামলার শিকার হচ্ছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থানগুলো হলো চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ, নোয়াখালী সদর, জামালপুরের মেলান্দহ, ফেনী সদর, নওগাঁ সদর, লক্ষ্মীপুর সদর, নারায়গঞ্জের আড়াইহাজার, মৌলভীবাজারের বড়লেখা, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট এবং ঝিনাইদহের মহেশপুর। দলটির দাবি, এসব স্থানে বিএনপির নেতাকর্মীরাই সংঘবদ্ধভাবে তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। জামায়াত আরও অভিযোগ করে যে, এমনকি তাদের নারী কর্মীদেরকেও সমাজের বিভিন্ন স্তরে পরিচালিত দাওয়াতি (আহ্বানমূলক) কার্যক্রমে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং হয়রানি করা হচ্ছে।
মজলিসে শূরা প্রশ্ন তুলেছে, যেখানে একটি রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে অস্ত্রের মুখে তাদের মৌলিক রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না এবং তাদের কর্মীদের ওপর হামলা হচ্ছে, সেখানে কীভাবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আশা করা যায়? কেন্দ্রীয় শূরা মনে করে, এই ধরনের সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ প্রমাণ করে যে, সরকার এখন পর্যন্ত নির্বাচনের জন্য উপযুক্ত এবং আস্থাভাজন পরিবেশ সৃষ্টি করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে পাবনার ঈশ্বরদীর ঘটনা নিয়ে কিছু সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত একটি রিপোর্টের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২৯ নভেম্বর প্রকাশিত দু-একটি পত্রিকায় লেখা হয়েছে যে, ‘পাবনার ঈশ্বরদীতে পিস্তল হাতে ভাইরাল যুবক জামায়াত কর্মী’।
জামায়াতের মজলিসে শূরা গভীর বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করছে যে, যখন পাবনার ঈশ্বরদীতে জেলা জামায়াতের আমিরসহ নেতাকর্মীদের ওপর বিএনপির সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা করেছে বলে তারা দাবি করছেন, ঠিক তখনই উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। মজলিসে শূরা এই ধরনের ভিত্তিহীন ও মিথ্যা তথ্য পরিবেশনকে ‘তথ্য সন্ত্রাস’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। কেন্দ্রীয় শূরা সংশ্লিষ্ট পত্রিকা কর্তৃপক্ষের প্রতি অবিলম্বে এই ধরনের তথ্য সন্ত্রাস চালানো থেকে বিরত থাকার জন্য আহ্বান জানিয়েছে, যা রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও ঘোলাটে করে তুলতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে নির্বাচনের পথ সুগম করার জন্য কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে। মজলিসে শূরা অভিমত ব্যক্ত করেছে যে, নির্বাচনের সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্ন পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত হবে:
১. অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের তালিকা তৈরি: দেশের বিভিন্ন স্থানে সক্রিয় সকল অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা দ্রুত প্রস্তুত করতে হবে। ২. অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধার: তালিকাভুক্ত সকল সন্ত্রাসীকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং তাদের কাছ থেকে সকল অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে।
জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এই দাবিগুলো এমন এক সময়ে করা হলো, যখন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জোট ও মহাজোটের রাজনৈতিক সমীকরণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে দলগুলোর মধ্যেকার আধিপত্যের দ্বন্দ্ব তীব্র হচ্ছে। জামায়াতের নেতারা আশা করছেন, তাদের এই দাবি আমলে নিয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে, যাতে দেশের নাগরিকরা নির্ভয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে। এই পদক্ষেপগুলোই পারে আসন্ন নির্বাচনকে অর্থবহ ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে।
