বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারপারসন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাঁর শারীরিক অবস্থা এখন ‘সংকটাপন্ন’ পর্যায়ে রয়েছে এবং দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলছে। তবে বর্তমানে তাঁর শারীরিক পরিস্থিতি এতটাই অস্থিতিশীল যে, জরুরি চিকিৎসার জন্য বিদেশে স্থানান্তরের কোনো সুযোগ নেই। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শনিবার (২৯ নভেম্বর) বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল মূলত বিজয়ের মাস উপলক্ষে বিএনপির ‘রোড শো’ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়ার জন্য। তবে স্বাভাবিকভাবেই সংবাদ সম্মেলনের মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দলের চেয়ারপারসনের শারীরিক অবস্থা। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর বক্তব্যে বেগম খালেদা জিয়াকে ‘বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেত্রী’ এবং ‘গণতন্ত্রের মাতা’ হিসেবে অভিহিত করে তাঁর অসুস্থতা নিয়ে দেশবাসীর উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। তিনি নিশ্চিত করেন, বেশ কয়েকদিন ধরে অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকা খালেদা জিয়ার শারীরিক পরিস্থিতি বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
বিএনপি মহাসচিব জানান, অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ড বেগম জিয়ার চিকিৎসার তদারকি করছেন। এই মেডিকেল বোর্ডের নির্দেশনায় দেশের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক দল চিকিৎসা কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। একই সঙ্গে চিকিৎসার গুণগত মান এবং সঠিক রোগ নির্ণয়ের স্বার্থে বিদেশে সুপরিচিত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান—যুক্তরাষ্ট্রের ‘জন হপকিংস’ এবং যুক্তরাজ্যের ‘লন্ডন ক্লিনিক’-এর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে পরামর্শ করা হচ্ছে। দূর নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে স্থানীয় চিকিৎসক দল সম্মিলিতভাবে তাঁর চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, যা তাঁর শারীরিক অবস্থার ভয়াবহতাকেই তুলে ধরছে।
উল্লেখ করা যেতে পারে, গত ২৩ নভেম্বর রাতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বিএনপি চেয়ারপারসনকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁর বুকে ‘সংক্রমণ’ ধরা পড়লে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত দুই দিন ধরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটায় এবং তা ‘সংকটজনক’ হলে দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়ে শুক্রবার সারাদেশে বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বিশেষ দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এই ধরনের বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজনই ইঙ্গিত দেয়, দলের শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে কতটা উদ্বিগ্ন।
সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করানোর বিষয়টি নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানান। তিনি বলেন, ‘গতকাল রাতে (শুক্রবার) চিকিৎসকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে চলা এই সভায় দেশি ও বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মতামত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হয়।’ এই বৈঠকেই বেগম জিয়ার বর্তমান চিকিৎসা পদ্ধতি ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা নিয়ে সুদূরপ্রসারী আলোচনা হয়।
বিএনপি মহাসচিব জানান, মেডিকেল বোর্ডের চিকিৎসকরা একমত পোষণ করেছেন যে, খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তবে বর্তমানে তাঁর শারীরিক পরিস্থিতি এমন নয় যে, তাঁকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে স্থানান্তরিত করা সম্ভব। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘তাকে (ম্যাডামকে) বিদেশে নেওয়ার মতো শারীরিক অবস্থা নেই।’ তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, আল্লাহর অশেষ রহমতে যদি তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল হয় এবং ঝুঁকি কমলে, কেবল তখনই তাঁকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে বিবেচনা করা হবে। এই তথ্যটি বিএনপির নেতাকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে হতাশার জন্ম দিয়েছে, কারণ তারা দীর্ঘদিন ধরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে বিদেশে পাঠানোর দাবি জানিয়ে আসছেন।
যদিও বর্তমানে শারীরিক অস্থিতিশীলতার কারণে বিদেশে স্থানান্তর সম্ভব হচ্ছে না, তবুও বিএনপি কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করে রেখেছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, বিদেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে ধরনের প্রয়োজনীয় কাজ, যেমন—ভিসা সংগ্রহ, অন্যান্য দেশের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন এবং অত্যাধুনিক এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা—সেই কাজগুলো মোটামুটিভাবে গুছিয়ে রাখা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যদি চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে সবুজ সংকেত আসে এবং যদি দেখা যায় যে ‘শি ইজ রেডি টু ফ্লাই’ (তিনি ভ্রমণের জন্য প্রস্তুত), তবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাঁকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। এই ধরনের পূর্ব প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে যাতে শারীরিক অবস্থার উন্নতি হওয়ার সাথে সাথেই সময় নষ্ট না করে তাঁকে প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া যায়।
সংবাদ সম্মেলনের একেবারে শেষে বিএনপি মহাসচিব দেশবাসী ও দলের নেতাকর্মীদের প্রতি একটি বিশেষ অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এ দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী। তাঁর অসুস্থতায় দেশের আপামর জনসাধারণ উদ্বিগ্ন ও উৎকণ্ঠিত।’ এর ফলস্বরূপ, অসংখ্য মানুষ হাসপাতালে ভিড় করছেন, যা এক বিশাল সমস্যার সৃষ্টি করছে।
মির্জা ফখরুল বলেন, হাসপাতালে ভিড়ের কারণে কর্তৃপক্ষ এবং চিকিৎসকরা যেমন বিব্রত বোধ করছেন, তেমনি বেগম জিয়ার চিকিৎসা কার্যক্রম ও একইসঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি থাকা অন্যান্য রোগীদের চিকিৎসাও ব্যাহত হচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে সংশ্লিষ্ট সবার কাছে অনুরোধ জানান যে, ‘আপনারা কেউ দয়া করে হাসপাতালে ভিড় করবেন না।’ তিনি আশ্বাস দেন, দল সময়মতো তাঁর শারীরিক অবস্থার সর্বশেষ খবর গণমাধ্যমকে জানাবে। এই ভিড় এড়িয়ে চলার অনুরোধ, দলের নেত্রীর প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও আবেগের গভীরতাকেই প্রতিফলিত করে।
সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পাশে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাত এবং বিজয়ের রোড শো কর্মসূচি উদযাপন কমিটির সদস্য জুবায়ের বাবুসহ অন্যান্য নেতারা। বেগম খালেদা জিয়ার এই সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের রাজনীতিতে যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে, তাতে বিএনপির ঘোষিত রোড শো কর্মসূচির চেয়েও তাঁর জীবনরক্ষাই বর্তমানে দলের প্রধান মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
