আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আঙিনায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এবার এক চরম সংকটের রূপ নিয়েছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং পরবর্তী সময়ে আইপিএল থেকে মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছিল, তা এবার বিশ্বকাপের মঞ্চে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। আসন্ন ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের লিগ পর্বে বাংলাদেশের নির্ধারিত চারটি ম্যাচই ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও, সেখানে দল না পাঠানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। এই বিষয়ে নিজেদের অনড় অবস্থানের কথা জানিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসিকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে বোর্ড।
আজ রোববার দুপুরে বিসিবির ১৭ জন পরিচালকের উপস্থিতিতে এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে বোর্ড পরিচালকদের সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচে অংশগ্রহণ করবে না বাংলাদেশ। বিসিবির একজন দায়িত্বশীল পরিচালক বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
আইসিসিকে পাঠানো ই-মেইল বার্তায় বিসিবি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিয়ে গভীর শঙ্কা রয়েছে। এই নিরাপত্তার অজুহাতে তারা ভারতের কোনো ভেন্যুতে খেলতে ইচ্ছুক নয়। বিসিবি তাদের আবেদনে বাংলাদেশের ম্যাচগুলোর ভেন্যু ভারত থেকে সরিয়ে অন্য কোনো দেশে স্থানান্তরের অনুরোধ জানিয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দশম আসরের যৌথ আয়োজক ভারত ও শ্রীলঙ্কা। এর আগে ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক বৈরিতার কারণে পাকিস্তানের সব ম্যাচ লঙ্কান ভেন্যুতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। বিসিবিও এখন একই ধরনের ‘হাইব্রিড মডেল’ বা বিকল্প ভেন্যুর দাবি তুলছে।
পূর্বঘোষিত সূচি অনুযায়ী, আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ মার্চ পর্যন্ত অনুষ্ঠেয় এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ‘সি’ গ্রুপে অবস্থান করছে। যেখানে টাইগারদের প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছে সাবেক দুই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং নেপাল ও ইতালি। নির্ধারিত সূচিতে ৭ ফেব্রুয়ারি কলকাতার ইডেন গার্ডেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশের উদ্বোধনী ম্যাচ খেলার কথা ছিল। এমনকি ইংল্যান্ড ও ইতালির বিপক্ষে ম্যাচ দুটিও একই ভেন্যুতে এবং নেপালের বিপক্ষে শেষ ম্যাচটি মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তবে বিসিবির এই আকস্মিক চিঠির ফলে পুরো সূচি এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
এদিকে ভেন্যু জটিলতার মধ্যেই আজ বিশ্বকাপের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের দল ঘোষণা করেছে বিসিবি। প্রত্যাশিতভাবেই এই অভিযানে টাইগারদের নেতৃত্ব দেবেন লিটন দাস এবং সহ-অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সাইফ হাসান। তবে ঘোষিত দলে বেশ কিছু চমক ও বির্তক তৈরি হয়েছে। ফর্মে থাকা সত্ত্বেও স্কোয়াডে জায়গা পাননি নাজমুল হোসেন শান্ত। এছাড়া উইকেটরক্ষক জাকের আলী ও মাহিদুল ইসলাম অঙ্কনও বাদ পড়েছেন চূড়ান্ত তালিকা থেকে। অন্যদিকে ঘরোয়া ক্রিকেটে দারুণ পারফর্ম করা রিপন মন্ডল ও আলিস ইসলামকে স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিসিবি জানিয়েছে, আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রাথমিক দলে যেকোনো পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। এরপর কোনো রদবদল করতে হলে আইসিসির টেকনিক্যাল কমিটির অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। তবে দল ঘোষণার চেয়েও এখন মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ভেন্যু ইস্যুটি। বিসিবির এই শক্ত অবস্থান আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, আইসিসি বাংলাদেশের এই নিরাপত্তার দাবিকে কতটা গুরুত্বের সাথে নেয় এবং ভারত থেকে ভেন্যু সরিয়ে শ্রীলঙ্কা বা অন্য কোথাও নেওয়ার ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
