বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রের গভীরে কিছু নাম এমনভাবে খোদাই করা থাকে, যা সময়ের পরিবর্তনের সাথে ম্লান হয় না; বরং কালের বিবর্তনে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বেগম খালেদা জিয়া সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন, যিনি কেবল ক্ষমতার অংকে নয়, বরং কোটি মানুষের আবেগ ও বিশ্বাসের প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন। দীর্ঘ চার দশকের বর্ণাঢ্য ও কণ্টকাকীর্ণ রাজনৈতিক পথচলা শেষে ৩০ ডিসেম্বরের সেই বিষণ্ণ সকালে তিনি পাড়ি জমিয়েছেন না-ফেরার দেশে। তাঁর এই প্রয়াণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে কেবল একটি শূন্যতাই তৈরি করেনি, বরং একটি মহাকাব্যিক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছে।
এক বিস্ময়কর রূপান্তর: গৃহবধূ থেকে জাতীয় কাণ্ডারি
বেগম জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এক অনন্য পাঠ। ১৯৪৫ সালে দিনাজপুরে জন্ম নেওয়া এই মিতভাষী নারী দীর্ঘকাল ছিলেন স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছায়াসঙ্গী। কিন্তু ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর যখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) অস্তিত্ব সংকটে পড়ে, তখন দলের প্রয়োজনে এবং নেতা-কর্মীদের আকুল আবেদনে তিনি রাজনীতিতে পা রাখেন। ১৯৮২ সালে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণ এবং পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়া ছিল এক ঐতিহাসিক মোড়। একজন সাধারণ গৃহবধূর এমন বলিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতৃত্ব গ্রহণ ও দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা ছিল সে সময়ের এক অসাধ্য সাধন।
আপসহীনতার মূর্ত প্রতীক ও গণতন্ত্রের মুক্তি
নব্বইয়ের দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা তাঁকে ‘আপসহীন নেত্রী’র চিরস্থায়ী খেতাব এনে দেয়। দীর্ঘ নয় বছরের সেই সংগ্রামে তিনি অসংখ্যবার গৃহবন্দী ও কারান্তরীণ হয়েছেন, কিন্তু সামরিক জান্তার সাথে কোনো প্রকার গোপন সমঝোতায় পা দেননি। তাঁর এই অনড় অবস্থানের কারণেই ১৯৯০ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান সফল হয় এবং বাংলাদেশ পুনরায় গণতন্ত্রের স্বাদ পায়। ১৯৯১ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে জয়লাভ করে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, যা ছিল মুসলিম প্রধান দেশগুলোর জন্য এক বৈপ্লবিক বার্তা।
শাসনতান্ত্রিক সংস্কার ও সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনরুত্থান
বেগম জিয়ার শাসনামলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান হলো রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে উত্তরণ। ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে তিনি সকল রাজনৈতিক দলের সাথে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধানে দ্বাদশ সংশোধনী আনেন। এর মাধ্যমে ক্ষমতাকে ব্যক্তির হাত থেকে সংসদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয় এবং মন্ত্রিসভাকে জনপ্রতিনিধিদের কাছে জবাবদিহিমূলক করা হয়। এটি বাংলাদেশে জবাবদিহিতার রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিতকে শক্তিশালী করেছিল।
সামাজিক বিপ্লব ও নারী শিক্ষার স্বর্ণযুগ
বেগম খালেদা জিয়া বিশ্বাস করতেন, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীকে পেছনে রেখে উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশে নারী শিক্ষার ‘বিপ্লব’ শুরু হয়। মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি কর্মসূচি চালুর ফলে গ্রামীণ জনপদে নারী শিক্ষার হার অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। এছাড়া প্রশাসনে নারীদের কোটা প্রথা এবং উচ্চপদে নিয়োগের মাধ্যমে তিনি সামাজিক ক্ষমতায়নের পথ সুগম করেন। তাঁর সময়েই রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (EPZ) গুলোতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়, যা আজ আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পকে বিশ্ববাজারে শীর্ষস্থানে নিয়ে গেছে।
অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন
রাষ্ট্রীয় আয়ের উৎস বাড়াতে ও বৈদেশিক নির্ভরতা কমাতে ১৯৯১ সালে বেগম জিয়ার সরকার মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট (VAT) প্রবর্তন করে, যা আজও বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। তাঁর শাসনামলেই যমুনা বহুমুখী সেতুর কাজ সম্পন্ন হয় এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে অভূতপূর্ব পরিবর্তন আসে। কৃষি খাতে ভর্তুকি প্রদান এবং ‘ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ পৌঁছে দেওয়ার প্রাথমিক উদ্যোগগুলো তাঁর উন্নয়ন দর্শনেরই বহিঃপ্রকাশ ছিল।
জাতীয় সংহতি ও সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী
শহীদ জিয়ার দেওয়া ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ দর্শনের একনিষ্ঠ ধারক ছিলেন তিনি। ভাষা, ভূমি ও সংস্কৃতির সমন্বয়ে গঠিত এই স্বকীয় পরিচয়কে তিনি গণমানুষের হৃদয়ে গেঁথে দিতে সক্ষম হন। জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তিনি ছিলেন হিমালয়ের মতো অটল। তাঁর পররাষ্ট্রনীতি ছিল ভারসাম্যপূর্ণ, যেখানে জাতীয় স্বার্থই ছিল সর্বাগ্রে।
ত্যাগ ও উত্তরসূরিদের জন্য শিক্ষা
জীবনের শেষ দিনগুলোতে বেগম জিয়াকে চরম শারীরিক অসুস্থতা এবং কারাবাসের যাতনা সহ্য করতে হয়েছে। বিদেশ যাওয়ার বহু সুযোগ এলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে বারবার বলেছেন, “দেশই আমার ঠিকানা”। তাঁর এই দেশপ্রেম ও ত্যাগ তাঁকে কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নয়, বরং দেশের ‘মাতা’ বা ‘দেশনেত্রী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েও তিনি তাঁর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি।
মহাকালের পথে যাত্রা
বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন সফল প্রধানমন্ত্রী বা রাজনৈতিক দলের প্রধান ছিলেন না; তিনি ছিলেন গণতন্ত্রকামী মানুষের সাহসের বাতিঘর। তাঁর প্রয়াণে আজ তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হচ্ছে, উড়ছে অর্ধনমিত পতাকা। কিন্তু পতাকার এই শোক কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি কোটি মানুষের হৃদয়ের হাহাকার। তিনি নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আপসহীন সংগ্রামের মহাকাব্য এবং ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ এর অবিনাশী আদর্শ প্রজন্মের পর প্রজন্মকে প্রেরণা জোগাবে।
ইতিহাসের পাতায় তিনি এক প্রদীপ্ত সূর্য হয়ে বেঁচে থাকবেন। বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে তাঁর নাম উচ্চারিত হবে পরম শ্রদ্ধায়। মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। বিদায়, হে আপসহীন নেত্রী। আপনার কীর্তি ও ত্যাগ এই জাতি চিরকাল কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে।
