উপমহাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে পুলিশের ইউনিফর্ম বা পোশাক কেবল একটি পোশাক নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, শৃঙ্খলা এবং কর্তৃত্বের এক শক্তিশালী প্রতীক। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে পুলিশের পোশাকের রঙ পরিবর্তনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা জনমনে গভীর কৌতূহল ও বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা এই বাহিনী কি কেবল বাহ্যিক আবরণের পরিবর্তনের মাধ্যমেই জনবান্ধব হতে পারবে, নাকি এর মূলে প্রয়োজন এক গভীরতর মানসিক ও কাঠামোগত সংস্কার?
ঐতিহাসিকভাবে পুলিশের পোশাকের পরিবর্তনের ধারা এবং বর্তমানের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইউনিফর্ম পরিবর্তন করা যতটাই সহজ, দেড়শ বছরের পুরনো ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা ততটাই দুঃসাধ্য।
স্মরণ করা যেতে পারে যে, ব্রিটিশরা যখন এই অঞ্চলে পুলিশ বাহিনী গঠন করে, তখন তাদের পোশাকের জন্য সাদা রঙ বেছে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এ দেশের কর্দমাক্ত মাটির কারণে সেই সাদা পোশাক দ্রুতই ময়লা হয়ে যেত বিধায় পরবর্তীতে তা বাদামি বা খাকি রঙে রূপান্তর করা হয়। সেই খাকি ইউনিফর্ম প্রায় ২০০৪ সাল পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে টিকে ছিল।
এরপর সময়ের প্রয়োজনে এবং প্রশাসনিক বিন্যাসের খাতিরে ২০০৪ সালে শহরের জন্য হালকা জলপাই, রেঞ্জের জন্য গাঢ় নীল, র্যাবের জন্য কালো এবং এপিবিএন-এর জন্য ধূসর রঙের প্রবর্তন করা হয়। মানুষের স্মৃতির সাথে জড়বস্তুর গভীর সম্পর্ক থাকে; বিশেষ করে অতীতের বিভিন্ন শাসনামলে পুলিশের পোশাকের সাথে মানুষের অনেক বেদনাদায়ক ও ভীতিকর স্মৃতি জড়িয়ে আছে। সেই তিক্ত স্মৃতিগুলো মুছে ফেলার লক্ষ্যেই মূলত আগস্ট পরবর্তী সময়ে নতুন রঙের ইউনিফর্ম প্রবর্তনের যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়।
আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের বিষয়টি বেশ অনন্য এবং তাৎপর্যপূর্ণ। একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় পোশাক অনেক সময় ভয় ও নির্যাতনের প্রতীকে পরিণত হয়। বিগত দিনগুলোতে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ পুলিশের পোশাককে হয়রানি ও বলপ্রয়োগের সমার্থক হিসেবে দেখতে শুরু করেছিল। এমনকি পরিবর্তনের ঘোষণার পর মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের মাঝেও এক ধরনের মানসিক দ্বিধা ও হতাশা পরিলক্ষিত হয়েছে।
অনেকে রঙের পরিবর্তনকে নান্দনিকতার মানদণ্ডে বিচার করেছেন, কেউবা একে অর্থের অপচয় হিসেবে উপহাস করেছেন। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, মানুষের মন থেকে নেতিবাচক স্মৃতিগুলো মুছে ফেলার জন্য এবং পুলিশের মাঝে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করতে এই পরিবর্তন অপরিহার্য ছিল।
কিন্তু মূল সংকটটি পোশাকের রঙের চেয়েও অনেক গভীরে প্রোথিত। সমাজতাত্ত্বিক ও অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, সংস্কারের ক্ষেত্রে পোশাক পরিবর্তন সবচেয়ে দৃশ্যমান ও সহজ পদক্ষেপ হলেও, এটি প্রকৃত সংস্কারের বিকল্প হতে পারে না। মানবাধিকার নিশ্চিত করার জন্য পুলিশের প্রশিক্ষণে কী ধরনের গুণগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে, কিংবা অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা নির্মূলে কী কী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—সেই প্রশ্নগুলো আজও অস্পষ্ট।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পোশাক পরিবর্তনকে মানসিকতা পরিবর্তনের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখলেও, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে বিগত দেড়শ বছরে ইউনিফর্মের রঙ বারবার বদলালেও পুলিশের আচরণগত দর্শনে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। ১৯৬১ সালের পুলিশ আইনের যে ঔপনিবেশিক কাঠামো, যা সরাসরি সেবার পরিবর্তে নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্বারোপ করে, তা আজও এই বাহিনীর প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে আছে।
প্রকৃত সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত কমিশনগুলো রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ অবস্থানে থেকে কাজ করছে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন। বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামোকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার মতো সাহসী পদক্ষেপের অভাব এখানে স্পষ্ট। পুলিশের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হ্রাস এবং দুর্নীতি নির্মূলের জন্য যে ধরনের আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন, প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোতে তার পূর্ণ প্রতিফলন পাওয়া যাচ্ছে না।
স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন, অভিযানে বডি-ক্যামের ব্যবহার নিশ্চিত করা, এবং অজ্ঞাতনামা আসামিদের নামে ঢালাও মামলা বন্ধ করার মতো যে পরামর্শগুলো দেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু এই নীতিগুলো বাস্তবায়নের রূপরেখা ও স্বচ্ছতা নিয়ে এখনও জনমনে সংশয় রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা যায়, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সেবা-ভিত্তিক পুলিশিং মডেলের জন্য ‘কমিউনিটি পুলিশিং’ হলো মূল ভিত্তি। এটি পুলিশ এবং জনগণের মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতার সেতুবন্ধন তৈরি করে। অথচ বাংলাদেশে সংস্কার প্রক্রিয়ায় কমিউনিটি পুলিশিংকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি এবং ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলগুলোর ঐকান্তিক সমর্থন ছাড়া এই সংস্কার টেকসই হওয়া অসম্ভব।
কারণ, অধ্যাদেশের মাধ্যমে করা যেকোনো পরিবর্তন পরবর্তী সরকারগুলো খুব সহজেই বাতিল করে দিতে পারে। তাই পুলিশকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের দীর্ঘদিনের যে সংস্কৃতি, তা থেকে বের হয়ে আসার জন্য রাজনৈতিক ঐক্যমত্য অপরিহার্য।
২০২৫ সালের নভেম্বর মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরও দেখা যাচ্ছে, একটি পুনরুজ্জীবিত ও জনবান্ধব পুলিশ বাহিনীর স্বপ্ন এখনও অনেকাংশে অধরাই রয়ে গেছে। মূলধারার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত চিত্রগুলো নির্দেশ করে যে, পুলিশ এখনও পুরনো রাজনৈতিক বলয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই কাজ করছে। সংস্কারের তালিকায় অগ্রাধিকারের বিষয়টি অনেক নিচে নেমে গেছে বলে মনে হয়।
পরিশেষে বলা যায়, ইউনিফর্ম পরিবর্তন একটি প্রতীকী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে, কিন্তু যদি এর সাথে পেশাদারিত্ব, জবাবদিহিতা এবং মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয় না ঘটে, তবে এই বিশাল আয়োজন কেবল কাপড়ের রঙ পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। বাংলাদেশ কি ব্যর্থ সংস্কারের দীর্ঘ তালিকায় আরও একটি নাম যুক্ত করবে, নাকি সত্যিই একটি সেবামুখী পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলবে—তা সময়ই বলে দেবে।
