চায়ের দেশ সিলেটের সবুজ টিলা আর নয়নাভিরাম লাক্কাতুরা স্টেডিয়াম এখন প্রস্তুত এক জমজমাট ক্রিকেট যুদ্ধের জন্য। আগামীকাল শুক্রবার থেকে শুরু হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল)-এর ১২তম আসর। তবে উদ্বোধনী দিনের মাঠের লড়াই শুরু হওয়ার আগেই মাঠের বাইরে একের পর এক নাটকীয়তা, নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর সতর্কতা এবং টিকিটের জন্য দর্শকদের হাহাকার—সব মিলিয়ে এক মিশ্র আবহে দেশের ক্রিকেটের এই বড় উৎসবের পর্দা উঠতে যাচ্ছে। এবারের আসরটি যেমন দুই বন্ধু নাজমুল হোসেন শান্ত ও মেহেদী হাসান মিরাজের লড়াই দিয়ে শুরু হচ্ছে, তেমনি নেতিবাচক খবরের শিরোনামে এসে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে নোয়াখালী এক্সপ্রেস ফ্র্যাঞ্চাইজি।
সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের প্রবেশপথেই চা বাগান আর পাহাড়ের যে মুগ্ধতা, তা পর্যটকদের জন্য সবসময়ই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। এই মায়াবী মাঠেই কাল উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হবে সিলেট টাইটান্স এবং রাজশাহী ওয়ারিয়র্স। ম্যাচটি নিয়ে ক্রীড়াপ্রেমীদের বাড়তি আগ্রহের মূল কারণ দুই দলের নেতৃত্বে থাকা দুই প্রাণের বন্ধু—শান্ত ও মিরাজ। মাঠের বাইরে তাদের সখ্যতা সর্বজনবিদিত হলেও কালকের ২২ গজে কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ।
রাজশাহীর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত আজ সিলেটে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘হোম ক্রাউডের বিপক্ষে খেলা সবসময়ই চ্যালেঞ্জিং এবং রোমাঞ্চকর। আমাদের দলের সবাই এই চ্যালেঞ্জ নিতে মুখিয়ে আছে। কোনো নির্দিষ্ট দলকে এগিয়ে রাখছি না, যারা কাল ভালো খেলবে তারাই জয়ী হবে।’ অন্যদিকে সিলেটের অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ তার স্বপ্নের কথা জানিয়ে বলেন, ‘সিলেট কখনও চ্যাম্পিয়ন হয়নি। আমার স্বপ্ন সিলেটের মানুষকে প্রথম শিরোপার স্বাদ দেওয়া।’
তবে এই উৎসবের আমেজে কিছুটা তাল কাটছে মাঠের বাইরের অস্থিরতা। বিপিএল শুরুর মাত্র এক দিন আগে চট্টগ্রাম রয়্যালসের মালিকানা পরিবর্তন এবং নোয়াখালী এক্সপ্রেসে কোচিং স্টাফদের ধর্মঘটের মতো ঘটনাগুলো বিসিবির ব্যবস্থাপনাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে নোয়াখালী এক্সপ্রেসের দুই কোচ খালেদ মাহমুদ সুজন ও তালহা জুবায়েরের অনুশীলন ছেড়ে চলে যাওয়া ছিল দিনের সবচেয়ে বড় টক অব দ্য কান্ট্রি।
অনুশীলনের সরঞ্জাম না পাওয়া এবং কর্মকর্তাদের অপেশাদার আচরণের অভিযোগ তুলে তারা মাঠ ছাড়লেও বিকেলের দিকে পুনরায় দলে ফেরেন। সুজন এই ঘটনাকে ‘হিট অব দ্য মোমেন্ট’ বা সাময়িক উত্তেজনা বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, টুর্নামেন্টের মাঝে এমন ঘটনা ঘটার চেয়ে শুরুতে হওয়া একদিক থেকে ভালো, কারণ এতে ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়ে দলের বন্ধন আরও দৃঢ় হবে।
এদিকে সিলেটের মাঠে দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে এবং যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা হয়েছে পুরো স্টেডিয়াম এলাকা। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবার নিরাপত্তার জন্য ৬০৫ জন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বিশেষ করে গ্যালারিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিষয়ে পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।
পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি এবং অতীতের যেকোনো ত্রুটি কাটিয়ে নতুন উদ্যমে প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি।’ উল্লেখ্য যে, দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এবার পূর্বনির্ধারিত জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বাতিল করে সীমিত পরিসরে কিছু সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে আসর শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিসিবি।
টিকিটের চাহিদা এবার সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। শতভাগ ডিজিটাল বা ‘পেপারলেস’ পদ্ধতিতে টিকিট বিক্রি করায় দর্শকদের মধ্যে যেমন আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে, তেমনি টিকিট না পাওয়ার আক্ষেপও রয়েছে অনেকের। বিসিবি পরিচালক আমজাদ হোসেন নিশ্চিত করেছেন যে, প্রথম দুই দিনের সব টিকিট ইতিমধ্যে অনলাইনে বিক্রি হয়ে গেছে।
সিলেটের দর্শকরা সবসময়ই ক্রিকেটের প্রতি অনুরাগী, আর এবার অনলাইন পদ্ধতিতে টিকিট ছাড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা নিঃশেষ হয়ে যাওয়া সেই জনপ্রিয়তারই প্রমাণ দেয়। কালকের উদ্বোধনী দিনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব।
সব মিলিয়ে বিতর্ক আর রোমাঞ্চের হাত ধরাধরি করে শুরু হতে যাচ্ছে বিপিএলের এই আসর। মাঠকর্মীরা আজও গভীর রাত অবধি স্টেডিয়ামের শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এখন শুধু অপেক্ষা কালকের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের, যখন ব্যাট-বলের লড়াইয়ে সব বিতর্ক ছাপিয়ে মাঠের ক্রিকেটই হয়ে উঠবে মুখ্য। সিলেটের এই নৈসর্গিক স্টেডিয়ামে গ্যালারিভর্তি দর্শকের গর্জনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে বাংলাদেশের ক্রিকেটের এক নতুন অধ্যায়।
