বাংলাদেশের ক্রিকেটে প্রতিভার অভাব নেই, কিন্তু সেই প্রতিভাকে বিশ্বমানের পর্যায়ে বিকশিত করার মতো পর্যাপ্ত ঘরোয়া পরিবেশ কি আমাদের আছে? এমন এক গভীর প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান নাজমুল আবেদিন ফাহিম।
সোমবার রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি যেমন জাতীয় দলের পেসারদের সামর্থ্য নিয়ে উচ্চাশা প্রকাশ করেছেন, তেমনি দেশের ক্রিকেট অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা নিয়েও প্রকাশ করেছেন তীব্র আক্ষেপ। তার মতে, আমাদের ক্রিকেটাররা আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোতে যখন দাপট দেখান, তখনই তাদের প্রকৃত সামর্থ্য বিশ্বের সামনে উন্মোচিত হয়।
আজ সোমবার ক্রীড়া সাংবাদিকদের সংগঠন বিএসজেএ আয়োজিত ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শেষে বিসিবির এই পরিচালক দেশের ক্রিকেটের বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। নাজমুল আবেদিন ফাহিম জানান, বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত সাফল্যে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠ হলো, দেশের মাটিতে সেই মানের প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট আয়োজনে আমরা এখনো অনেকটা পিছিয়ে।
তিনি মনে করেন, আমাদের ক্রিকেটারদের জন্য যে ধরনের উন্নত মানের টুর্নামেন্ট বা পিচ প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করতে না পারায় অনেকটা বাধ্য হয়েই বিদেশের বড় ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোর ওপর নির্ভর করতে হয়। এই লিগগুলোতে আমাদের প্রতিনিধিরা যখন ভালো খেলেন, তখনই বোঝা যায় যে তারা সত্যিকার অর্থেই বিশ্বমানের।
বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের বর্তমান প্রাণভ্রমরা মুস্তাফিজুর রহমান বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত সাফল্য পাচ্ছেন। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে তার কাটার ও গতির বৈচিত্র্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তবে নাজমুল আবেদিন ফাহিম মনে করেন, মুস্তাফিজ একাই নন, তার ছায়ায় তৈরি হচ্ছে একঝাঁক প্রতিভাবান তরুণ পেসার।
তিনি বর্তমান পেস ইউনিটের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তরুণ তুর্কি তানজিম হাসান সাকিবের ভূয়সী প্রশংসা করেন। ফাহিম বলেন, “মুস্তাফিজ যদি ১০-এর মধ্যে ১০ পাওয়ার যোগ্য হন, তবে তানজিম সাকিবকে আমি সাড়ে আট বা নয়ের কম কোনোভাবেই দিতে পারব না।” তার এই রেটিং থেকে স্পষ্ট যে, মুস্তাফিজের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সাকিবের আগ্রাসন ও কার্যকারিতাকে বোর্ড সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিসিবির এই অভিজ্ঞ পরিচালক আরও যোগ করেন যে, জাতীয় দলে বর্তমানে ৪-৫ জন পেসার রয়েছেন যারা প্রায় সমমানের দক্ষতা রাখেন। হয়তো মুস্তাফিজের মতো সবাই আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোতে নিয়মিত সুযোগ পাচ্ছেন না বলে বিশ্বজুড়ে তাদের সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে না। তবে ঘরোয়া ক্রিকেটে তাদের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে বোর্ড নিশ্চিত যে, বড় মঞ্চে পারফর্ম করার মতো সামর্থ্য তাদের প্রত্যেকেরই আছে।
ভবিষ্যতে এই তরুণরা যখন আইপিএল বা পিএসএলের মতো আসরে সুযোগ পাবেন, তখন ক্রিকেট বিশ্ব বাংলাদেশের পেস ইউনিটের প্রকৃত শক্তি টের পাবে। এই ইতিবাচক দিকটি দেশের ক্রিকেটের জন্য একটি বড় শক্তির জায়গা বলে তিনি মনে করেন।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রেক্ষাপটে মুস্তাফিজুর রহমানের পুরো আইপিএল মৌসুমে অংশগ্রহণের অনুমতি (এনওসি) প্রদান থেকে শুরু করে নিলামে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের দরদাম নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তার মাঝেই ফাহিমের এই মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বিসিবি এখন কেবল ক্রিকেটারদের বিদেশে খেলার অনুমতি দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না, বরং দেশের মাটিতেও উচ্চমানের ক্রিকেট অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। অভিজ্ঞ এই ক্রিকেট বিশ্লেষকের মতে, সঠিক পরিচর্যা ও নিয়মিত মানসম্পন্ন ম্যাচ আয়োজনের ব্যবস্থা করা গেলে বাংলাদেশ বিশ্ব ক্রিকেটে কেবল পেস বোলিংয়েই নয়, সব বিভাগেই পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারবে।
